ইফতার করে সিয়াম নষ্ট করছেননাতো?

ইফতার করে সিয়াম নষ্ট করছেননাতো?


বন্ধুগণ!
আজ আমরা এমন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি,
যে বিষয়ে মানুষ যুগের পর যুগ ধরে ভুলের মধ্যে আছে—
সিয়ামের সাথে সাথে মানুষ একটা শব্দকে খুব ভালো ভাবেই চেনে তা হল ইফতার,
ইফতার করে সিয়াম নষ্ট হচ্ছেনাতো?
আসেলই কি ইফতার সিয়াম নষ্ট করে দেয়?
এই ইফতার শব্দটার অর্থ কি?
সত্যিই যদি ইফতার করে সিয়াম নষ্ট হয়,
তাহলে আমাদের কি করা উচিৎ
আজ আমরা জানবো সেই কথা,
আজ আমরা জানবো ইফতারের রহস্য,

বন্ধুগণ!
ইফতার শব্দটি এসেছে ফুতুর থেকে,
যার মাদ্দা হলো ফা, ত, র,
যার অর্থ হল- চিরে ফেলা, ভেঙ্গে ফেলা,
এখানে ব্যবহার হয় সিয়াম ভেঙ্গে ফেলা অর্থে
বুঝতেই পারছেন, ইফতার করা মানে সিয়াম ভেঙ্গে ফেলা,
সারাদিন সিয়াম পালন করে তা যদি ভেঙ্গে ফেলেন,
তাহলে এই কষ্টের অর্থ কি?

বন্ধুগণ!
চলুন, আল্লাহ আমাদের কি নির্দেশ দিয়েছেন,
আল্লাহ আমাদের নির্দেশ করেছেন ইতমাম করতে,
ইতমাম শব্দটি এসেছে তাম্মা শব্দ থেকে।
যার মাদ্দা হল তা, মিম, মিম,
যার অর্থ হল- পূর্ণ করা বা পুর্নাঙ্গভাবে সম্পাদন করা।
আল্লাহ বলেছেন,
ছুম্মা আতিম্মুস সিয়ামু ইলাল লাইল।
তোমরা সিয়াম পুর্ণ কর রাত পর্যন্ত। ২ঃ১৮৭

এবার প্রশ্ন করি- আপনি কি সিয়াম ভেঙ্গে ফেলবেন,
নাকি আল্লাহর বিধান অনুযায়ী সম্পুর্ণ করবেন?
যদি সম্পুর্ণ করেন, তাহলে ভিডিওটি দেখা সম্পুর্ণ করুন আগে,
ভিডিও আপনার জন্যই, আজকে বিস্তারিত আলোচনা করবো,
কিভাবে ও কোন নির্দেশ মেনে চললে সিয়াম পুর্ণ  হয়।

বন্ধুগণ!
বহুবার আমরা শুনেছি, সূর্যাস্ত হলেই সিয়াম শেষ,
কিন্তু কুরআন কি সেই নির্দেশ দিয়েছে?
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الخَيطُ الأَبيَضُ مِنَ الخَيطِ الأَسوَدِ مِنَ الفَجرِ ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ
“তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ না ভোরের সাদা রেখা,
কালো রেখা থেকে স্পষ্ট হয়।
তারপর তোমরা সিয়াম পূর্ণ করো রাত পর্যন্ত। (২:১৮৭)

বন্ধুগণ!
লক্ষ্য করুন—আল্লাহ এখানে বলেছেন,
সিয়াম শুরু হবে ভোরের সাদা রেখা থেকে,
এবং শেষ হবে রাত পর্যন্ত। কোথাও বলা হয়নি সূর্যাস্ত পর্যন্ত। এই একটি শব্দ—إِلَى اللَّيْلِ (রাত পর্যন্ত)
এখানে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝায়। ইলাল লাইল।
এখন প্রশ্ন আসে—রাত বলতে কী বোঝানো হচ্ছে?
সূর্যাস্ত কি রাত ? কখনোই না।
কুরআন স্বয়ং সূর্যাস্ত এবং রাতকে আলাদা করেছে। উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ বলেন:
وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ الشَّمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبِهَا
“সূর্যোদয়ের আগে এবং সূর্যাস্তের আগে তোমার রবের প্রশংসা ঘোষণা কর।” (তাহা ২০:১৩০)

এখানেও সূর্যাস্ত আলাদা। আবার আল্লাহ বলেন:
إِذَا بَلَغَ مَغْرِبَ الشَّمْسِ وَجَدَهَا تَغْرُبُ
“যখন সে সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছল, সে দেখল সূর্য অস্ত যাচ্ছে।” (কাহাফ ১৮:৮৬)
এখানে সুর্যাস্ত শব্দের আরবী হল- গুরুবিশ শাম্ছ।
সুর্যাস্তের সময় যদি সিয়াম পুর্ণ হত তাহলে আল্লাহ বলতেন,
ছুম্মা আতিম্মুসিয়ামা ইলা গুরুবিশ শামছ।
তোমরা সিয়াম পুর্ণ কর সুর্যাস্ত পর্যন্ত।
কিন্তু তিনি বলেছেন সিয়াম পুর্ণ কর রাত পর্যন্ত। 

বন্ধুগণ,
সূর্যাস্ত হল দিনের শেষ মুহূর্ত, কিন্তু রাতের শুরু নয়। একইভাবে সূর্যাস্তের পরও কিছু সময় আকাশে আলো থাকে, যাকে আমরা গোধূলি বা সন্ধ্যা বলি।
কুরআনের ভাষাতেও আলাদা করে শব্দ ব্যবহার হয়েছে—শাফাক (গোধূলি), আসীল (সন্ধ্যা), লাইল (রাত)

আল্লাহ বলেন:
وَسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا
“সকাল এবং সন্ধ্যায় তাঁর প্রশংসা ঘোষণা কর।” (আহযাব ৩৩:৪২)
এখানে আছিলা শব্দের অর্থ হল- সন্ধ্যা।
وَاذْكُرِ اسْمَ رَبِّكَ بُكْرَةً وَأَصِيلًا
“সকাল ও সন্ধ্যায় তোমার রবকে স্মরণ কর।” (ইনসান ৭৬:২৫)

এখানে দেখাই যাচ্ছে — সন্ধ্যা এবং রাত আলাদা সময়।
অর্থাৎ সূর্যাস্ত কখনোই রাত নয়।
এরপর কুরআন শাফাক ও রাতের পার্থক্যও স্পষ্ট করেছে:
فَلَا أُقْسِمُ بِالشَّفَقِ وَاللَّيْلِ وَمَا وَسَقَ
“আমি শপথ করছি গোধূলির এবং রাতের।” (ইনশিকাক ৮৪:১৬‑১৭)

বন্ধুগণ!
এখানে দুটি ভিন্ন সময়—শাফাক এবং লাইল—আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে।
এটা প্রমাণ করে যে,
সূর্যাস্ত, সন্ধ্যা, গোধূলি, এবং রাত—সব ভিন্ন ভিন্ন সময়।
তাই কেবল সূর্যাস্তকে, সন্ধ্যাকে ও গোধুলিকে সিয়ামের শেষ সময় ধরে নেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়।

আল্লাহ একথা বলেননি যে,
ছুম্মা আতিম্মুসিয়ামা ইলা গুরুবিশ শামছ।
তোমরা সিয়াম পুর্ণ কর সুর্যাস্ত পর্যন্ত।
তিনি বলেননি,
ছুম্মা আতিম্মুসিয়ামা ইলাল আসল।
তোমরা সিয়াম পুর্ণ কর সন্ধ্যা পর্যন্ত।
তিনি বলেননি,
ছুম্মা আতিম্মুসিয়ামা ইলাশ শাফাক।
তোমরা সিয়াম পুর্ণ কর গোধুলি পর্যন্ত।

তিনি বলেছেন,
ছুম্মা আতিম্মুসিয়ামা ইলাল লাইল।
তোমরা সিয়াম পুর্ণ কর রাত পর্যন্ত।

এবার লক্ষ্য করি—
কুরআন কি শুধু শব্দ দিয়ে সময় নির্ধারণ করেছে,
নাকি প্রক্রিয়া ও পর্যায়ও নির্দেশ দিয়েছে? আল্লাহ বলেন:

وَآيَةٌ لَّهُمُ اللَّيْلُ نَسْلَخُ مِنْهُ النَّهَارَ
“তাদের জন্য একটি নিদর্শন হলো রাত—আমি এর মধ্য থেকে দিনকে সরিয়ে নিই।” (ইয়াসিন ৩৬:৩৭)

বন্ধুগণ,
এই আয়াত দেখায়—দিন ধীরে ধীরে চলে যায়,
এবং রাত ধাপে ধাপে আসে।
এটি মুহূর্তে ঘটে না। সূর্যাস্ত হল তার সূচনা মাত্র,
কিন্তু রাত প্রতিষ্ঠিত হতে আরও সময় লাগে।
আরেকটি আয়াত:
يُغْشِي اللَّيْلَ النَّهَارَ يَطْلُبُهُ حَثِيثًا
“তিনি রাতকে দিন দ্বারা আচ্ছাদিত করেন, যা দ্রুত তাকে অনুসরণ করে।” (আরাফ ৭:৫৪)

বন্ধুগণ,
কুরআন নিজেই সময়ের ক্রম দেখাচ্ছে—
দিন থেকে রাতের পরিবর্তন ধাপে ধাপে।
এটি আমাদের শেখাচ্ছে—সিয়ামের শেষ সীমা হিসেবে রাতের পূর্ণ উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ।

এবার আসি হাদিসের দিকে।
সালামুন আলা মুহাম্মাদ  বলেছেন:
“إذا أقبل الليل من هاهنا وأدبر النهار من هاهنا وغربت الشمس فقد أفطر الصائم”
“যখন রাত এদিক থেকে আসবে,
দিন সেদিক থেকে চলে যাবে এবং সূর্য অস্ত যাবে—
তখন রোজাদার ইফতার করবে।” (বুখারী, মুসলিম)

বন্ধুগণ!
লক্ষ্য করুন—হাদিসে তিনটি শর্ত দেওয়া হয়েছে:
রাত উপস্থিত হওয়া,
দিন চলে যাওয়া,
সূর্য অস্ত যাওয়া।
অর্থাৎ শুধুমাত্র সূর্যাস্ত যথেষ্ট নয়। এই শর্তগুলো নিশ্চিত হওয়ার পরে ইফতার করা যাবে।

আরেকটি হাদিসে সালামুন আলা মুহাম্মাদ বলেছেন:
“لا يزال الناس بخير ما عجلوا الفطر”
“মানুষ কল্যাণের মধ্যে থাকবে যতক্ষণ তারা দ্রুত ইফতার করবে।” (বুখারী, মুসলিম)
এখানে “দ্রুত” বলতে সময়ের আগে নয়—
সময় হওয়া পর দেরি না করা বোঝানো।
অর্থাৎ রাত নিশ্চিত হওয়ার পর বিলম্ব না করে ইতমাম করা উচিত।

বন্ধুগণ!
বাস্তব জীবনের উদাহরণও এ বিষয়ে সাহায্য করে।
সূর্যাস্তের পরে আকাশে কিছু সময় আলো থাকে—
ধীরে ধীরে তা মিলিয়ে যায়।
এই সময়কে আমরা গোধূলি বা সন্ধ্যা বলি।
এরপরে প্রকৃত রাত তখন প্রতিষ্ঠিত হয়।
কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা একসাথে দেখলে বোঝা যায়, সিয়াম পূর্ণ হওয়া মানে রাত প্রতিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা।

এবার শব্দগুলোর অর্থ ব্যাখ্যা করি:
• গুরুব (غروب): সূর্য ডোবার মুহূর্ত
• আসীল (أصيل): সন্ধ্যা, দিনের শেষ পর্যায়
• শাফাক (الشفق): গোধূলি, রাতের পূর্ববর্তী আলো
• লাইল (الليل): প্রকৃত রাত

বন্ধুগণ,
যখন আমরা এই শব্দগুলো একত্রে দেখি,
তখন বোঝা যায়—কেবল সূর্যাস্তকে সিয়ামের শেষ সীমা ধরা ভুল।
পুরো প্রক্রিয়া হল এমন —সূর্যাস্ত → আসীল → শাফাক → লাইল—
এই ধারাবাহিকতাকে বুঝলে কুরআনের নির্দেশের সত্যিকারের অর্থ সামনে আসে।

বন্ধুগণ!
আজ আমরা সেই ধারাবাহিকতায় হাদিসের আলোকে বিষয়টি আরও গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করব।
আমরা জানব—“দ্রুত ইফতার” বলতে আসলে কী বোঝানো হয়েছে,
এবং এটি কুরআনের নির্দেশের সাথে কিভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নবীজি বলেছেন,
“لا يزال الناس بخير ما عجلوا الفطر”
“মানুষ কল্যাণের মধ্যে থাকবে যতক্ষণ তারা দ্রুত ইফতার করবে।” (বুখারী, মুসলিম)

বন্ধুগণ!
প্রথমবার এই হাদিস পড়লে অনেকেই ভাবেন—
দ্রুত মানে সূর্যাস্ত দেখামাত্রই ইফতার।
কিন্তু ভাষাগত বিশ্লেষণ দেখায়—
“দ্রুত” মানে হলো সময় উপস্থিত হওয়ার পর বিলম্ব না করা
অর্থাৎ রাত নিশ্চিত হওয়ার পরে,
কেউ ইফতারে দেরি করলে,
সেটি হাদিসের নির্দেশনার বিপরীত হবে।

আরেকটি হাদিসে নবীজি বলেছেন:
“أحب عبادي إلي أعجلهم فطراً”
“আমার বান্দাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় সেই ব্যক্তি যে দ্রুত ইফতার করে।” (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)

বন্ধুগণ!
এখানে আবারও প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে—
ইফতারের জন্য ধৈর্য্যের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
যখন রাত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে,
তখন বিলম্ব না করে ইফতার করাই সেরা সিদ্ধান্ত।

চলুন!
এখন আমরা কুরআনের নির্দেশের সঙ্গে হাদিসের মিল দেখি।
কুরআন স্পষ্টভাবে বলেছে:
ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ
“তারপর তোমরা সিয়াম পূর্ণ করো রাত পর্যন্ত।” (২:১৮৭)

এখানে বলা হয়েছে সিয়াম পূর্ণ করতে হবে রাত পর্যন্ত।
হাদিস বলছে—রাত নিশ্চিত হওয়ার পর দেরি না করে ইফতার করা।
দেখা যাচ্ছে—কুরআন ও হাদিস একে অপরকে পরিপূরক করছে।

বন্ধুগণ,
এখন আমরা আরও একটি হাদিস দেখি
যা এই বিষয়কে আরও পরিষ্কার করে। নবীজি বলেছেন:
“إذا أقبل الليل من هاهنا وأدبر النهار من هاهنا وغربت الشمس فقد أفطر الصائم”
“যখন রাত এদিক থেকে আসবে,
দিন সেদিক থেকে চলে যাবে
এবং সূর্য অস্ত যাবে—
তখন রোজাদার ইফতার করবে।” (বুখারী)

বন্ধুগণ!
লক্ষ্য করুন—হাদিসে তিনটি বাক্য রয়েছে:
১. যখন রাত এদিক থেকে আসবে,
২. যখন দিন ওদিক থেকে চলে যাবে,
৩. যখন সূর্য অস্ত যাবে, তখন রোজাদার ইফতার করবে।

এখানে ভালোভাবে খেয়াল করুন।
বুখারীর হাদিসে কথাগুলোকে উল্টো করে সাজানো হয়েছে,
এই উল্টো সাজানোর ফলে হাজার বছর ধরে মানুষ
সিয়াম ভেঙ্গে নষ্ট করছে।
মুসলিম শরিফের হাদিসে কথাগুলোকে সঠিকভাবে সাজানো হয়েছে,
কিন্তু সেই হাদিস চাপা পরে গেছে বুখারীর উল্টা হাদিসের নিচে।
মুসলিম শরিফে হাদিসটি এভাবে সাজানো হয়েছে,
১. যখন সূর্য অস্ত যাবে
২. যখন দিন ওদিক থেকে চলে যাবে,
৩.  যখন রাত এদিক থেকে ঘনিয়ে আসবে, তখন রোজাদার ইফতার করবে।

এটি প্রমাণ করে—ইফতার শুধুমাত্র সূর্যাস্তের উপর নির্ভর করে না।
রাতের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পরই ইফতার করা উচিত। সূর্যাস্ত হল সেই পরিবর্তনের সূচনা,  রাত নিশ্চিত হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত নয়।

এবার আমরা হাদিসের আরও একটি দিক দেখি।
নবীজি বলেছেন:
“لا يزال الناس بخير ما عجلوا الفطر ولا يأخذوا يومهم في السحور إلا بالخير”
“মানুষ কল্যাণের মধ্যে থাকবে যতক্ষণ তারা দ্রুত ইফতার করবে এবং সাহরী বিলম্বে করবে।” (তিরমিজি)

বন্ধুগণ!
এটি দেখাচ্ছে—রোজাদারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো সময়ের প্রতি সচেতনতা।
ইফতার করার সময় দেরি করা উচিত নয়।
এটি কেবল ব্যক্তিগত কল্যাণ নয়,
সামাজিক কল্যাণকেও নির্দেশ করছে।
কারণ যখন সবাই নির্দিষ্ট সময়ে ইতমাম করে,
তখন সাহরী ও ইফতার সমন্বয় সহজ হয়,
এবং সামজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন হয়।

এখন আমরা বাস্তব পর্যবেক্ষণ দেখি।
সূর্যাস্তের পর আকাশে কিছু সময় আলো থাকে।
কুরআনের ভাষায় এটিকে বলা হয়েছে শাফাক
এটি রাতের আগের ধাপ।
বাস্তব জীবনে এটি প্রায় ৪০–৭২ মিনিট স্থায়ী হতে পারে,
ঋতু ও ভৌগোলিক অবস্থার উপর নির্ভর করে।

বন্ধুগণ!
যদি কেউ সূর্যাস্ত দেখামাত্রই ইফতার শুরু করে,
তবে তিনি রাতের আসল উপস্থিতি নিশ্চিত করছেন না। হাদিস অনুযায়ী,
রাত নিশ্চিত হওয়ার পরে দ্রুত ইতমাম করা সঠিক।
এই মিল কুরআন ও হাদিসের মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরি করে।

এবার আমরা হাদিস ও কুরআনের সময় নির্ধারণ একত্রে দেখি।
কুরআন বলছে,
• শুরু: ফজরের সাদা রেখা স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত পানাহার।
• শেষ: রাত পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করা।

হাদিস বলছে,
• রাত নিশ্চিত হওয়ার পর দেরি না করে ইফতার করা।
• সূর্যাস্ত শুধু সূচক, কিন্তু রাত নিশ্চিত হওয়ার পূর্বশর্ত।

বন্ধুগণ!
এখানে আমরা দেখেছি—“দ্রুত ইফতার”
এবং “রাত পর্যন্ত পূর্ণ করা” একে অপরকে সমর্থন করছে। হাদিস নির্দেশ দেয়—সময় চলে এলে বিলম্ব না করা,
আর কুরআন নির্দেশ দেয়—সিয়াম পূর্ণ করো রাত পর্যন্ত।

এবার আমরা উদাহরণ দেই বাস্তব জীবনের।
পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সূর্যাস্তের পর আকাশে আলো থাকে,
যা ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
কুরআনের ভাষায়—“শাফাক” এবং “লাইল”।
হাদিস নির্দেশ দেয়—রাত নিশ্চিত হওয়ার পর দ্রুত ইফতার।
এই বাস্তব পর্যবেক্ষণ দেখায় কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা একে অপরের সাথে মিলে যায়।

বন্ধুগণ, চলুন
এবার আমরা একটি চিত্রের মাধ্যমে দেখি।
❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️
প্রশ্ন:
কেউ কেউ প্রশ্ন করেন—পৃথিবীতে এমন কোনো গোষ্ঠী কি আছে যারা রাতে সিয়াম ভঙ্গ করে,
অর্থাৎ শাফাক বা গোধূলির পরে ইতমাম করে?
বাস্তবে কি এমন কোনো ঐতিহাসিক উদাহরণ আছে?

উত্তর:
হ্যাঁ, অবশ্যই রয়েছে।
পৃথিবীর অনেক মানুষ যারা কুরআন মেনে চলেন,
তারা অনেক আগে থেকেই  গোধুলীর পর রাতে ইতমাম করে।
অপরদিকে,
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে ইসলামের ইতিহাসের প্রাচীনকাল থেকেই একটি সুপরিচিত গোষ্ঠী—শিয়া সম্প্রদায়—
গোধূলির পর, অর্থাৎ সূর্যাস্তের কিছু সময় পরে ইফতার করার পদ্ধতি অনুসরণ করে আসছে।
এটি তাদের নিজস্ব ফিকহি ব্যাখ্যা,
এবং হাদিস-ভিত্তিক ঐতিহ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি প্রাচীন আমল,
যা বহু শতাব্দী ধরে ধারাবাহিকভাবে পালন করে যাচ্ছে।

শিয়া হাদিসে “ইফতারের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে,
সূর্যাস্তের সাথে সাথে নয়,
বরং আকাশে লাল আভা বা গোধূলির আলোর বিলুপ্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করার মাধ্যমে।
তাদের বহু প্রাচীন হাদিসগ্রন্থে এই বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায়।

শিয়াদের হাদিস গ্রন্থসমূহের মধ্যে আল-কাফি,
তাহযিবুল আহকাম, 
এবং মান লা ইয়াহদুরুহুল ফকীহ-
এসব গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে ইফতারের উত্তম সময় তখন, যখন আকাশের লাল আভা মিলিয়ে যায় এবং রাত সুস্পষ্টভাবে নেমে আসে।
এসব বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, কেবল সূর্য দিগন্তের নিচে যাওয়াই যথেষ্ট নয়;
বরং প্রকৃত অন্ধকারের সূচনা পর্যন্ত অপেক্ষা করা অধিক নিরাপদ ও উত্তম।

উদাহরণস্বরূপ,
শিয়া হাদিসসংকলন আল-কাফি-তে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে,
“যখন পূর্ব আকাশের লাল আভা দূর হয়ে যায়,
তখন ইফতার করার সঠিক সময়।”
এই নির্দেশনা তাদের বহু আলেম ঐতিহাসিকভাবে অনুসরণ করেছেন
একই ধরনের বক্তব্য তাহযিবুল আহকামেও বর্ণিত হয়েছে,
যেখানে বলা হয়েছে যে দিনের সমাপ্তি নিশ্চিতভাবে বোঝা যাওয়ার পর ইফতার করতে হবে এটাই সঠিক পথ।

ফলে দেখা যায়,
ইতিহাসের বহু শতাব্দী ধরে শিয়া মুসলিম সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ,
গোধূলির পর, ইফতার করে আসছে।
এই ইতমাম নতুন কোনো বিধান নয়;
বরং তাদের প্রাচীন হাদিসের কিতাবে লিপিবদ্ধ।
আজও বিশ্বের বহু দেশে শিয়া মুসলমানরা একই পদ্ধতিতে সিয়াম পালন করে—
সূর্যাস্তের সাথে সাথে নয়, বরং গোধূলির আভা মিলিয়ে যাওয়ার পরে ইফতার করে।

এখন আবার কেউ কেউ বলবেন,
“আমরা শিয়াদের হাদিস মানব না”
জি! ভাই দারুন মজার ব্যাপার, 
আবার অন্যদিকে শিয়ারাও বলে—
“আমরা সুন্নিদের হাদিস মানব না।”
এই দুই দলের বক্তব্য শুনে,
তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে:
হাদিস কি শিয়া আর সুন্নিদের?
নাকি হাদিস মূলত নবী সালামুন আলা মুহাম্মদের?

বাস্তবতা হলো,
হাদিস কোনো সম্প্রদায়ের সম্পত্তি নয়;
হাদিস নবীর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা।
কিন্তু যখন এক দল অন্য দলের হাদিসকে বাতিল করে,
তখন কি উভয় দল হাদিস অস্বীকার কারী হয়না?

এখানে আমাদের অবস্থানটি ভিন্ন।
আমাদের পরিচয় কোনো দলীয় পরিচয় নয়;
আমাদের পরিচয় আমরা মুসলিম।
আমরা কোনো নির্দিষ্ট মাযহাব বা সম্প্রদায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে সত্য নির্ধারণ করতে চাই না।
আমরা শিয়া বা সুন্নি— কারো অন্ধ অনুসারী নই,
আমাদের মূল উৎস হলো কুরআন।
কারণ কুরআন এমন একটি গ্রন্থ যা নিয়ে মুসলিম উম্মাহর ভেতরে মৌলিক কোনো মতভেদ নেই;
সবাই এটিকে আল্লাহর সংরক্ষিত বাণী হিসেবে স্বীকার করে।

তাই কেউ যদি প্রশ্ন করে—
“আপনারা কার হাদিস মানেন?”
আমাদের উত্তর হয়: আমরা দলীয় পরিচয়ের কারণে কোনো বর্ণনাকে গ্রহণ বা বর্জন করি না।
আমরা প্রথমে কুরআনের বক্তব্য দেখি।
যদি কোনো বিষয়ে কুরআন স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়,
তাহলে সেই নির্দেশনাই আমাদের জন্য চূড়ান্ত মানদণ্ড,
দলীয় মতভেদ যেখানে সংঘর্ষ তৈরি করে,
সেখানে কুরআনই আমাদের জন্য ঐক্যের কেন্দ্র।

ইফতারের সময় নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে,
সেটিও মূলত এই দলীয় পার্থক্যের ফল।
একদল সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে ইফতারকে যথেষ্ট মনে করে,
অন্যদল গোধূলি শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে।
কিন্তু আমাদের অবস্থান হলো—
কুরআনে দিন কিভাবে শেষ হয়,
রাত কিভাবে শুরু হয় সব স্পষ্ট, 
তাই আমরা দলীয় পরিচয়ের কারণে নয়,
বরং কুরআনের নির্দেশনাকে  মেনে চলি।

কুরআনের স্পষ্ট বিধান থাকার পরেও কেউ কেউ প্রশ্ন করে,
এমন কোন হাদিস কি নাই, 
যেই হাদিসে রাতে ইতমাম করার বিষয়টি স্পষ্ট?

উত্তরে আমি বলবো,  হ্যাঁ, এমন বর্ণনা রয়েছে।
ইমাম মালিকের প্রসিদ্ধ হাদিসগ্রন্থ মুওয়াত্তা মালিক-এ,
এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিসের উল্লেখ আছে,
কিছু সাহাবি মাগরিবের সালাত আদায় করার পর,
যখন রাতের অন্ধকার স্পষ্ট হতে দেখা যেত,
তখন ইফতার করতেন।

হাদিসটি হলো—
«হুমায়দ ইবনে আব্দুর রহমান (রহ.) থেকে বর্ণিত:
“উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) এবং উসমান ইবনে আফফান (রা.) উভয়ে রাত্রির অন্ধকার ঘনিয়ে আসা দেখতে পাওয়ার সময় মাগরিবের সালাত আদায় করতেন, এবং তা ছিল ইফতার করার পূর্বে। এরপর তারা ইফতার করতেন। আর এটি ছিল রমজান মাসে।” (মুওয়াত্তা মালিক, হাদিস নং ৬২৬)

এই বর্ণনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে,
সাহাবিদের আমলের মধ্যে এমন দৃষ্টান্ত ছিল
যেখানে মাগরিবের সালাত আদায়ের সময়
রাতের অন্ধকার স্পষ্ট হওয়ার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হতো, এবং তারপর ইফতার করা হতো।

আশা করি বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে,
যদি আপনি রেফারেন্স সহ বিস্তারিত জানতে চান,
তাহলে ডিস্ক্রিপসনে লিংক দেয়া আছে দেখে নিন।
ধন্যবাদ সবাইকে
ভালো থাকবেন,
সালামুন আলাইকুম।

Post a Comment

0 Comments

শিয়া সুন্নিদের হাদিস কতগুলো

ইফতার করে সিয়াম নষ্ট করছেননাতো?
Chat with us on WhatsApp