কখন থেকে শুরু হয় মুসলিম জাতির অধঃপতন

 কখন থেকে শুরু হয় মুসলিম জাতির অধঃপতন

বন্ধুগণসহ,
মুসলিম জাতির অধঃপতন বুঝতে গেলে আগে আমাদের একটি সত্য মেনে নিতে হবে—এই পতন হঠাৎ আসেনি। কোনো এক যুদ্ধে হারার কারণে,
কোনো এক শহর পতনের কারণে,
কিংবা কোনো এক বিদেশি শক্তির আক্রমণে জাতির অধঃপতন শুরু হয়নি।
পতন শুরু হয়েছিল তার বহু আগেই,
মানুষের চিন্তার ভেতরে, নৈতিকতার ভেতরে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতির ভেতরে।
ইতিহাসে যে পতন আমরা দেখি, তা ছিল শুধু ভেতরের ভাঙনের বাহ্যিক প্রকাশ।
কুরআন নাজিল হয়েছিল মানুষকে শাসন করার জন্য নয়,
মানুষকে পথ দেখানোর জন্য।
কিন্তু এই পথ দেখানো মানে শুধু নামাজ, রোজা বা ব্যক্তিগত ইবাদত নয়;
বরং পরিবার, সমাজ, বিচার, রাজনীতি, অর্থনীতি—সবকিছুর মানদণ্ড।
সালামুন আলা মুহাম্মাদ এর যুগে কুরআন ঠিক এইভাবেই কাজ করত।
কোনো সমস্যা হলে বলা হতো—“আল্লাহ কী বলেন?” এই প্রশ্নটাই ছিল সভ্যতার ভিত্তি।

বন্ধুগণসহ,
কিন্তু কুরআন নিজেই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। নবীর জবানিতে আল্লাহ বলিয়েছেন—
وَقَالَ الرَّسُولُ يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَٰذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا
“হে আমার রব, আমার জাতি এই কুরআনকে পরিত্যক্ত করেছে।” —সূরা ফুরকান, ২৫:৩০

এই আয়াত কিয়ামতের দিনের কথা বললেও,
এর ইঙ্গিত দুনিয়ার ইতিহাসের দিকেই যায়।
কুরআন পরিত্যক্ত হওয়া মানে কুরআন পোড়ানো নয়,
কুরআন মুখস্থ না করা নয়।
বরং কুরআন থাকা সত্ত্বেও জীবন পরিচালনায় কুরআনকে পাশে সরিয়ে রাখা।

বন্ধুগণসহ,
নবীর ইন্তেকালের পর প্রথম যে বড় পরিবর্তনটি আসে,
তা ছিল মানুষের মনোভাবের পরিবর্তন।
সাহাবারা তখনো জীবিত ছিলেন,
কুরআন তখনো তাজা ছিল, কিন্তু সমাজ বড় হচ্ছিল,
রাষ্ট্র বিস্তৃত হচ্ছিল, নতুন নতুন স্বার্থ যুক্ত হচ্ছিল।
ঠিক এই জায়গাতেই পরীক্ষা শুরু হয়—
মানুষ কি কুরআনকে শেষ কথা হিসেবে রাখবে,
নাকি সুবিধার সাথে মিলিয়ে নেবে?
খুলাফায়ে রাশেদীনের প্রথম দিকটা ছিল কুরআনের শাসনের বাস্তব রূপ।
আবু বকর (রাঃ) বলেন, “আমি ভালো করলে আমাকে সাহায্য করো, ভুল করলে আমাকে সংশোধন করো।”
এই কথার ভেতরেই কুরআনের শাসন লুকানো ছিল।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই মানসিকতা দুর্বল হতে থাকে। উসমান (রাঃ)–এর শেষ দিকের অস্থিরতা, তাঁর শাহাদাত,
তারপর আলী (রাঃ)–এর যুগের ফিতনা—এসব ছিল লক্ষণ, কারণ নয়।

বন্ধুগণসহ,
এই সময় থেকেই কুরআনের একটি নির্দেশ ধীরে ধীরে পেছনে যেতে থাকে—
فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ
“কোনো বিষয়ে মতভেদ হলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও।” —সূরা নিসা, ৪:৫৯
মতভেদ তখনো ছিল,
কিন্তু কুরআনের কাছে পুরোপুরি ফিরে যাওয়ার বদলে মানুষ,  দল, গোত্র ও রাজনৈতিক অবস্থানকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে।
কারবালার ঘটনা এই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট চিহ্ন। এখানে বিষয়টি শুধু একটি পরিবারের সাথে অন্য পরিবারের সংঘর্ষ নয়।
প্রশ্ন ছিল—ক্ষমতা কি কুরআনের অধীনে থাকবে,
নাকি কুরআন ক্ষমতার অধীনে হবে?
ইয়াজিদের শাসন কুরআনের মানদণ্ডে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ নীরব থাকে।
এই নীরবতাই ছিল কুরআন ছাড়ার বাস্তব রূপ।
কুরআন এ বিষয়ে আগেই সতর্ক করেছিল—
وَلَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ
“জালিমদের দিকে ঝুঁকে পড়ো না।” —সূরা হূদ, ১১:১১৩
ঝুঁকে পড়া মানে শুধু সমর্থন করা নয়; চুপ করে থাকাও ঝুঁকে পড়ার অন্তর্ভুক্ত।

বন্ধুগণসহ,
এই সময় থেকে কুরআন ধীরে ধীরে নৈতিক উপদেশের বই হয়ে ওঠে, কিন্তু শাসনের মাপকাঠি আর থাকে না। বিচার হয় শক্তির ভিত্তিতে, সিদ্ধান্ত হয় সুবিধার ভিত্তিতে, আর কুরআনের আয়াত পড়ে শোনানো হয় শুধু বৈধতার মোড়ক হিসেবে। কুরআন এই দ্বিচারিতাকে কঠোর ভাষায় নাকচ করেছে—
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ
“তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশ মানো, আর কিছু অংশ অস্বীকার করো?” —সূরা বাকারা, ২:৮৫
এই আয়াত সরাসরি অবিশ্বাসীদের উদ্দেশ্যে হলেও,
ইতিহাসে এর বাস্তব প্রতিফলন আমরা মুসলিম সমাজেই দেখি।

বন্ধুগণসহ,
উমাইয়া ও পরবর্তী যুগে কুরআনের সংরক্ষণ হয়েছিল, তিলাওয়াত হয়েছিল, কুরআনের হরফ বদলায়নি—
কিন্তু কুরআনের আত্মা সমাজ থেকে সরে যাচ্ছিল।
মানুষ আল্লাহর বিধানকে কঠিন মনে করতে শুরু করে,
আর নিজের সুবিধাকে বাস্তববাদ বলে চালাতে থাকে।
ঠিক এই মনোভাব নিয়েই কুরআন সতর্ক করেছিল—
أَمْ لَهُمْ شُرَكَاءُ شَرَعُوا لَهُمْ مِنَ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَنْ بِهِ اللَّهُ
“তাদের কি এমন অংশীদার আছে, যারা আল্লাহ অনুমোদন না দেওয়া বিধান তৈরি করেছে?” —সূরা শূরা, ৪২:২১
এটা শুধু নতুন ধর্ম বানানো নয়;
বরং আল্লাহর বিধানের জায়গায় মানুষের বিধান বসানো।

বন্ধুগণসহ,
এই অভ্যন্তরীণ বিচ্যুতির ফল দেখা যায় ইতিহাসের বড় ধাক্কাগুলোতে।
আন্দালুস হারানো, ক্রুসেড, মঙ্গোল আক্রমণ—এসবকে আমরা সাধারণত পতনের কারণ ভাবি।
কিন্তু ইবন খালদুন পরিষ্কারভাবে বলেন,
এগুলো কারণ নয়, ফল।
জাতি তখনই ভাঙে, যখন তার নৈতিক ঐক্য ভেঙে যায়। কুরআন এক বাক্যে এই নিয়ম বলে দেয়—
ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ غَيَّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ
“এটা এজন্য যে তারা নিজেদের ভেতরের অবস্থা বদলে ফেলেছিল।” —সূরা আনফাল, ৮:৫৩

বন্ধুগণসহ,
অতএব মুসলিম জাতির অধঃপতন শুরু হয়েছিল সেই দিন,
যেদিন কুরআনকে সম্মান করা হলো,
কিন্তু অনুসরণ করা হলো না;
যেদিন আয়াত ছিল মুখে, কিন্তু সিদ্ধান্তে ছিল না;
যেদিন কুরআন ছিল মসজিদে,
কিন্তু বাজারে, আদালতে ও ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিল না।
এই নীরব অবমাননাই ছিল মুল সমস্যা,
যার ফল আমরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভোগ করছি।

বন্ধুগণসহ,
কুরআন যখন জীবন থেকে সরে যায়, তখন শূন্যতা সৃষ্টি হয়।
সেই শূন্যতা কখনোই খালি থাকে না।
সেখানে ঢুকে পড়ে ক্ষমতার লোভ,
জাতিগত অহংকার, দলাদলি এবং দুনিয়াবি স্বার্থ।
কুরআন এই মানবিক দুর্বলতাকে আগেই চিহ্নিত করে বলেছে—
كَلَّا بَلْ تُحِبُّونَ الْعَاجِلَةَ ۝ وَتَذَرُونَ الْآخِرَةَ
“না, বরং তোমরা দুনিয়াকেই ভালোবাসো এবং আখিরাতকে উপেক্ষা করো।” —সূরা কিয়ামাহ, ৭৫:২০–২১
ইতিহাসে মুসলিম সমাজে এই দুনিয়ামুখী মানসিকতা বাড়ার সাথেই পতনের গতি ত্বরান্বিত হয়।

বন্ধুগণসহ,
উমাইয়া ও পরবর্তী যুগে রাষ্ট্র বড় হয়, সম্পদ বাড়ে,
কিন্তু কুরআনের আত্মসংযম ও জবাবদিহির শিক্ষা দুর্বল হতে থাকে।
শাসকরা নিজেদের আল্লাহর সামনে জবাবদিহির বদলে নিজেদের ক্ষমতা রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়।
অথচ কুরআন স্পষ্ট করে বলেছিল—
وَقِفُوهُمْ ۖ إِنَّهُم مَّسْئُولُونَ
“তাদের থামাও, নিশ্চয়ই তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।” —সূরা সাফফাত, ৩৭:২৪
যখন এই জবাবদিহির অনুভূতি হারিয়ে যায়,
তখন শাসন আর ইবাদত থাকে না, হয়ে ওঠে আধিপত্য।

এই সময় থেকেই সমাজে দুই ধরনের ইসলাম দেখা যেতে শুরু করে।
এক ইসলাম মুখে—খুতবা, তিলাওয়াত, স্লোগানে।
আরেক ইসলাম বাস্তবে—যেখানে লেনদেন, বিচার ও ক্ষমতায় কুরআনের প্রভাব নেই।
এই দ্বৈততা কুরআনের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা। আল্লাহ বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ
“হে মুমিনগণ, তোমরা যা করো না তা কেন বলো?” —সূরা সাফ, ৬১:২
এই আয়াত শুধু ব্যক্তিগত চরিত্রের কথা নয়, বরং পুরো জাতির জন্য সতর্কবার্তা।

বন্ধুগণসহ,
যখন সমাজ এই দ্বিচারিতায় অভ্যস্ত হয়ে যায়,
তখন সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য ঝাপসা হয়ে যায়।
মানুষ আর প্রশ্ন করে না—“এটা কি কুরআনসম্মত?”
বরং প্রশ্ন করে—“এটা কি আমাদের পক্ষে?”
এখানেই কুরআনের সাথে সম্পর্ক কার্যত ছিন্ন হয়।
আল্লাহ এই মানসিকতাকে বলেছেন—
اتَّخَذُوا أَهْوَاءَهُمْ إِلَٰهًا
“তারা তাদের প্রবৃত্তিকেই উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে।” —সূরা জাসিয়া, ৪৫:২৩
ইতিহাসে মুসলিম সমাজে এই প্রবৃত্তির শাসনই ভিত নাড়িয়ে দেয়।
এর ফল হিসেবে সমাজে ঐক্য ভেঙে পড়ে।
দল, বংশ, অঞ্চল ও ক্ষমতার ভিত্তিতে মানুষ ভাগ হয়ে যায়। অথচ কুরআন উম্মাহর ভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করেছিল—
إِنَّ هَٰذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً
“নিশ্চয়ই এই তোমাদের উম্মাহ একক উম্মাহ।” —সূরা আম্বিয়া, ২১:৯২
এই আয়াত উপেক্ষিত হওয়ার ফলেই ইতিহাসে আমরা ক্রমাগত অন্তর্দ্বন্দ্ব, গৃহযুদ্ধ ও বিভাজন দেখতে পাই।

বন্ধুগণসহ,
যখন উম্মাহ ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে,
তখন বাইরের শক্তির আঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে।
ক্রুসেড, মঙ্গোল আক্রমণ কিংবা পরবর্তী উপনিবেশ—
এসব কোনো হঠাৎ দুর্যোগ ছিল না।
ইবন খালদুন পরিষ্কারভাবে বলেছেন,
যে জাতি নৈতিক সংহতি হারায়,
সে জাতি সামরিক শক্তি দিয়েও টিকে থাকতে পারে না। কুরআন এই ঐতিহাসিক নিয়মকে সংক্ষেপে বলে—
وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ
“এই দিনগুলো আমি মানুষের মধ্যে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দিই।”
—সূরা আলে ইমরান, ৩:১৪০
ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, নৈতিকতা হারালে তা হাতছাড়া হয়।

এই পতনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো—
মানুষ তখনো নিজেদের ঠিক মনে করে।
তারা ভাবে সমস্যার কারণ বাইরের শত্রু,
ষড়যন্ত্র বা সময়ের নিষ্ঠুরতা। কিন্তু কুরআন বারবার আয়না ধরিয়ে দেয়—
مَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ
“তোমাদের যে বিপদ আসে, তা তোমাদের হাতের কামাইয়ের কারণেই।” —সূরা শূরা, ৪২:৩০
এই আয়াত ইতিহাসের ভাষ্যকে ধর্মীয় ভাষায় প্রকাশ করে।

অতএব পতন থামেনি কারণ কুরআনের সাথে সম্পর্ক পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি।
কুরআন পড়া হয়েছে, কিন্তু কুরআনের কাছে ফিরে যাওয়া হয়নি।
কুরআন সম্মানিত হয়েছে, কিন্তু কুরআনকে বিচারক বানানো হয়নি।
যতদিন এই অবস্থার পরিবর্তন না হবে,
ততদিন আল্লাহর সুন্নাহ বদলাবে না।
আল্লাহ স্পষ্ট করে বলেছেন—
إِن تَنصُرُوا اللَّهَ يَنصُرْكُمْ
“তোমরা যদি আল্লাহকে সাহায্য করো, আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন।” —সূরা মুহাম্মদ, ৪৭:৭
আল্লাহকে সাহায্য মানে আল্লাহর বিধানকে জীবনের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা।

বন্ধুগণসহ,
মুসলিম জাতির অধঃপতন কোনো এক যুগে সীমাবদ্ধ ঘটনা নয়।
এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া,
যতদিন কুরআনকে জীবন থেকে আলাদা রাখা হবে,
ততদিন এই পতনের ধারা চলতেই থাকবে।
ইতিহাস এখানে সাক্ষী, আর কুরআন তার ব্যাখ্যাকার।

Post a Comment

0 Comments

শিয়া সুন্নিদের হাদিস কতগুলো

কুরআনের আলোকে ঢেকে দেওয়ার শিল্প
Chat with us on WhatsApp