কিয়ামুল লাইল কি তারাবীর নামাজ?

 িয়ামুল লাইল কি তারাবীর নামাজ?


লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ

আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল ‘আলামীন।
আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী খালাকাস্ সামাওয়াতি ওয়াল আরদ।
আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী আনযালা ‘আলা ‘আব্দিহিল কিতাব।
আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী খালাকাল ইনসান, আল্লামাহুল বায়ান।
সালামুন আলা মুহাম্মাদ আল্লাযি যা'য়া বিল কুরআনি মুহাইমিনা।
ও সালামুন আলাল মুরসালিন, আল্লাযিনা কানু হুদান ওয়া রহমাতান লিন্নাস।
রব্বী আউযুবিকা মিন হামাযাতিশ্ শায়াতিন।
ওয়া আউযুবিকা আন ইয়াহদুরূন।
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।
রব্বিশ রহলি ছদরী।
ওয়া ইয়াস্সিরলী আমরী।
ওয়াহলুল উকদাতাম মিল লিসানী।
ইয়াফকাহু কওলী।

বন্ধুগণ!
আজ আমরা একটি শব্দের গভীরে প্রবেশ করবো।
একটি আয়াতের আহ্বান বুঝবো।
একটি প্রচলিত ভুল বোঝাবুঝি সরিয়ে দেবো।
প্রশ্ন করা হয়—
কিয়ামুল লাইল কি তারাবীর সালাত?
এটি কি একটি নির্দিষ্ট রাকাতের নাম?
এটি কি কেবল রমাদানের একটি জামাতভিত্তিক ইবাদত?

বন্ধুগণ!
উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের কুরআনের ভাষায় ফিরতে হবে।
পরিভাষা আগে কুরআনে আছে কিনা দেখতে হবে।
শব্দটি কোথায় এসেছে দেখতে হবে।
আল্লাহ তাআলা সূরা মুযাম্মিলের শুরুতে বলেন—
يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا
(সূরা আল-মুযাম্মিল : ১–২)
হে চাদরে আবৃত।
রাতে দাঁড়াও, অল্প অংশ ছাড়া।

বন্ধুগণ!
এখানে শব্দটি “কিয়ামুল লাইল” নয়।
এখানে শব্দটিقُمِ اللَّيْلَ
এটি একটি আদেশ।
এটি সরাসরি সম্বোধন।
এটি নবীর প্রতি ব্যক্তিগত আহ্বান।
নবী চাদরে আবৃত ছিলেন।
নবী বিশ্রামে ছিলেন। নবী নিভৃতে ছিলেন।
ওহী আসার ভারে অন্তর ভারাক্রান্ত ছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে নির্দেশ চলে এল—
উঠো। রাতের মধ্যে দাঁড়াও।

বন্ধুগণ!
“قُم” মানে উঠো।
শুধু দাঁড়াও নয়। ঘুম ভাঙাও। অলসতা ত্যাগ করো।
আরামের অবস্থা ছেড়ে দাও।
এরপর “اللَّيْلَ” মানে রাত।
অন্ধকারের সময়। কোলাহল মুক্ত নিঃশব্দের সময়।
যখন মানুষ মানুষের দৃষ্টির আড়ালের চলে যায় ।
অতএব “قُمِ اللَّيْلَ” মানে— রাতের মধ্যে জেগে ওঠো।
অন্তরের ঘুম ভাঙাও। আরামের চাদর সরাও।

বন্ধুগণ!
এখানে ফোকাস শুধু শারীরিক দাঁড়ানো নয়।
এখানে ফোকাস অন্তরের জাগরণ।
এখানে ফোকাস প্রস্তুতি।
এখানে ফোকাস দায়িত্বের ভার বহনের প্রস্তুতি।
এরপর আল্লাহ বলেন—
نِصْفَهُ أَوِ انقُصْ مِنْهُ قَلِيلًا أَوْ زِدْ عَلَيْهِ
(সূরা আল-মুযাম্মিল : ৩–৪)
রাতের অর্ধেক। অথবা কিছু কম। অথবা কিছু বেশি।

বন্ধুগণ!
এখানে নির্দিষ্ট রাকাতের হিসাব নেই।
এখানে ৮, ১১, ২০–এর বিতর্ক বা ঝগড়া নাই।
এখানে মিনিটের হিসাব নেই।
এখানে সময়ের বিস্তৃতি আছে।
এটি একটি আধ্যাত্মিক সময় নির্ধারণ।
এটি রাতের নির্জনতায় প্রবেশের আহ্বান।
এই আহবান আত্মাকে প্রস্তুত করার আহ্বান।
এরপর আল্লাহ বলেন—
وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا
(সূরা আল-মুযাম্মিল : ৪)
কুরআন ধীরে ধীরে, স্পষ্টভাবে তিলাওয়াত করো।

বন্ধুগণ!
এই আয়াত পুরো বিষয়টি স্পষ্ট করে দেয়।
রাতে দাঁড়ানো মানে শুধু দাঁড়িয়ে থাকা নয়।
রাতে দাঁড়ানো মানে কুরআনের সাথে দাঁড়ানো।
রাতে দাঁড়ানো মানে ওহীর সাথে সংযুক্ত হওয়া।
এটি কুরআনকেন্দ্রিক কিয়াম।
এটি চিন্তাশীল কিয়াম।
এটি অন্তর কাঁপানো কিয়াম।
এরপর আল্লাহ বলেন—
إِنَّا سَنُلْقِي عَلَيْكَ قَوْلًا ثَقِيلًا
(সূরা আল-মুযাম্মিল : ৫)
নিশ্চয়ই আমরা আপনার উপর নাযিল করতে যাচ্ছি এক ভারী বাণী।

বন্ধুগণ!
ভারী বাণী গ্রহণের জন্য হালকা অন্তর যথেষ্ট নয়।
দিবসের কোলাহলে এই প্রস্তুতি হয় না।
রাতের নিঃশব্দে হৃদয় গড়ে ওঠে।
এ কারণেই বলা হয়েছে—
إِنَّ نَاشِئَةَ اللَّيْلِ هِيَ أَشَدُّ وَطْئًا وَأَقْوَمُ قِيلًا
(সূরা আল-মুযাম্মিল : ৬)
রাতের উঠা অধিক মজবুত । আর অধিক স্থির বাণী।

বন্ধুগণ!
রাতের কিয়াম আত্মাকে স্থির করে।
রাতের কিয়াম ভাষাকে সোজা করে।
রাতের কিয়াম অন্তরকে শুদ্ধ করে।
এখন প্রশ্ন—
এটি কি শুধু রমাদানের একটি নির্দিষ্ট সালাত?
এটি কি শুধু জামাতভিত্তিক আয়োজন?

বন্ধুগণ!
সূরা মুযাম্মিলের এই নির্দেশ রমাদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এটি একটি স্থায়ী প্রশিক্ষণ।
এটি নববী দায়িত্বের প্রস্তুতি।
পরে আল্লাহ হালকা করেছেন।
আল্লাহ বলেন—
فَاقْرَءُوا مَا تَيَسَّرَ مِنْهُ
(সূরা আল-মুযাম্মিল : ২০)
যতটুকু সহজ হয় ততটুকু পড়ো।

বন্ধুগণ!
এটি প্রমাণ করে— মূল বিষয় রাকাতের সংখ্যা নয়।
মূল বিষয় হলো রাতের নির্জনতায় কুরআনের সাথে দাঁড়ানো।
কুরআনের গভীরে হারিয়ে যাওয়া,
অতএব “কিয়ামুল লাইল” মানে—
রাতে জেগে ওঠা। রাতে কুরআনের সামনে দাঁড়ানো।
রাতে আত্মাকে শুদ্ধ করা।
এটি শুধু একটি নাম নয়। এটি একটি অবস্থা।
এটি একটি রুহানী যাত্রা।
তারাবীহ একটি আয়োজন হতে পারে।
কিন্তু “قُمِ اللَّيْلَ” একটি ব্যক্তিগত আহ্বান।
এটি অন্তরের ডাক। আরামের চাদর সরানোর ডাক।

বন্ধুগণ!
রাতের কিয়াম মানে— অন্ধকারে আলো খোঁজা।
নিঃশব্দে কুরআনের সুর শোনা।
একাকিত্বে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো।
এটি সংখ্যার বিষয় নয়। এটি হৃদয়ের বিষয়।
এটি লোক দেখানো বিষয় নয়। এটি নিভৃতে সংযোগের বিষয়।
“কুমিল লাইল” মানে—
উঠে দাঁড়াও। ঘুম থেকে। অবহেলা থেকে। আত্মতুষ্টি থেকে।
এই আহ্বান শুধু নবীর জন্য নয়।
এটি প্রত্যেক মুমিনের জন্য একটি চিরন্তন শিক্ষা।

বন্ধুগণ!
রাতের কিয়াম মানে— আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন।
কুরআনের দিকে প্রত্যাবর্তন। অন্তরের জাগরণ।
এটাই কিয়ামুল লাইলের গভীর অর্থ।
এটাই কুরআনিক আহ্বান। এটাই আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির পথ।
এরপর মূল নির্দেশ—
وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا
(সূরা আল-মুযাম্মিল : ৪)
কুরআন ধীরে ধীরে তিলাওয়াত করো।

বন্ধুগণ!
এখানে কোনো রীতির তালিকা নেই।
এখানে কোনো আনুষ্ঠানিক নাম নেই।
এখানে কোনো “তারাবীহ” শব্দ নেই।
এখানে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যাও নেই।
এখানে আছে— রাত। জেগে ওঠা। কুরআন। তরতীল।

বন্ধুগণ!
তরতীল মানে ধীর, মেপে, গভীরভাবে পাঠ।
তরতীল মানে অর্থ বুঝে পড়া।
তরতীল মানে আয়াতের ভেতরে প্রবেশ করা।
এরপর আল্লাহ বলেন—
إِنَّا سَنُلْقِي عَلَيْكَ قَوْلًا ثَقِيلًا
(সূরা আল-মুযাম্মিল : ৫)
আমি তোমার ওপর একটি ভারী বাণী নাযিল করতে যাচ্ছি।

বন্ধুগণ!
এই ভারী বাণী বহন করতে হলে অন্তর প্রস্তুত চাই।
রাতের নীরবতা সেই প্রস্তুতি দেয়।
রাতের জাগরণ সেই শক্তি দেয়।
এরপর ঘোষণা—
إِنَّ نَاشِئَةَ اللَّيْلِ هِيَ أَشَدُّ وَطْئًا وَأَقْوَمُ قِيلًا
(সূরা আল-মুযাম্মিল : ৬)
রাতের জাগরণ অধিক মজবুত। এবং বাক্যে অধিক স্থির।

বন্ধুগণ!
দিনের কোলাহল মনকে বিচ্ছিন্ন করে।
রাতের নির্জনতা মনকে একত্র করে।
রাতে শব্দ কম হয়। রাতে দৃষ্টি সীমিত।
রাতে হৃদয় আল্লাহর দিকে সহজে ফিরে যায়।
অতএব “কুমিল লাইল” একটি আধ্যাত্মিক আহ্বান।
এটি কুরআনের সাথে রাত কাটানোর আহ্বান।
এটি আত্মার পুনর্গঠনের আহ্বান।

বন্ধুগণ!
এখন প্রশ্ন— কুরআনে কোথাও “তারাবীহ” শব্দ আছে কি?
না। কোথাও নাই।
কুরআনে “পাঁচ ওয়াক্ত নামায" এভাবে তালিকাভুক্ত আছে কি?
না। কোথাও নাই।
কুরআন রীতির নাম নয়, কুরআন উদ্দেশ্যের ভাষা।
কুরআন বলে—
وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا
(সূরা আল-ফুরকান : ৬৪)
তারা রাত কাটায় তাদের রবের জন্য সিজদা ও কিয়ামে।

বন্ধুগণ!
এখানে আবার রাতের প্রসঙ্গ।
এখানে আবার দাঁড়ানো। আবার সিজদার কথা।
কিন্তু কোথাও নির্দিষ্ট নাম নেই।
কোথাও আনুষ্ঠানিক শিরোনাম নেই।
কারণ কুরআনের মূল বিষয়— রাতে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো।
রাতে কুরআনের সাথে থাকা।
রাতে আত্মাকে জাগানো।

বন্ধুগণ!
এই রমজান মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে।
অতএব রমযানের রাত কুরআনের রাত।
রমযানের রাত কিয়ামের রাত।
রমযানের রাত তিলাওয়াতের রাত।

কিন্তু কুরআন কোথাও “তারাবীহ” বলে না।
কুরআন বলে— রাতে ওঠো।
কুরআন পড়ো। তরতীল করো।

বন্ধুগণ!
আমরা নামের ভেতরে আটকে যাই।
কিন্তু কুরআন আমাদের নাম শেখাতে আসেনি।
কুরআন আমাদের জাগাতে এসেছে।
যে রাতে ওঠে।
যে কুরআন পড়ে। যে অর্থ বোঝে। যে কাঁদে।
যে কুরআনের বিধান মেনে নেয়।
সে “কুমিল লাইল” বাস্তবায়ন করছে।

বন্ধুগণ!
রাতের এই আহ্বান স্মৃতিমধুর।
কারণ রাত নীরব। রাত সাক্ষী।
রাত অন্তরের আয়না।
দিনে মানুষ অভিনয় করে।
রাতে মানুষ সত্য হয়।
যখন সবাই ঘুমায়,
একজন মুমিন উঠে দাঁড়ায়।
কুরআন খুলে বসে।
ধীরে ধীরে পড়ে।
আয়াতের ভেতরে ডুবে যায়।
এই দৃশ্যই “কুমিল লাইল”।

বন্ধুগণ!
আল্লাহ বলেন—
وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ
(সূরা আল-ইসরা : ৭৯)
রাতের অংশে তাহাজ্জুদ করো।
আবার রাত। আবার জাগরণ। আবার কুরআন।
এটি কোনো আনুষ্ঠানিক নাম নয়।
এটি একটি জীবনযাপন।
এটি একটি অভ্যাস।

বন্ধুগণ!
কুরআনের দৃষ্টিতে মূল বিষয়—
রাতের নীরবতায় আল্লাহর সাথে সংযোগ।
রাতের জাগরণে কুরআনের তিলাওয়াত।
মূল হলো— রাতে ওঠো। কুরআন পড়ো।
তরতীল করো।
আল্লাহর সামনে দাঁড়াও।

এই হলো কুরআনিক দৃষ্টিতে রাতের আহ্বান।
এই হলো “কুমিল লাইল”।
এই হলো আত্মার জাগরণ।
আল্লাহ আমাদেরকে সেই রাতের স্বাদ দান করুন।
আল্লাহ আমাদেরকে কুরআনের সাথে রাত কাটানোর তাওফিক দিন।
আল্লাহ আমাদের অন্তরকে রাতের তিলাওয়াতে দৃঢ় করুন।

ওয়াল্লাহু আ’লাম।

Post a Comment

0 Comments

শিয়া সুন্নিদের হাদিস কতগুলো

কিয়ামুল লাইল কি তারাবীর নামাজ?
Chat with us on WhatsApp