মাজহাব ও দলীয় স্বার্থে হাদিস তৈরী

 

মাজহাব ও দলীয় স্বার্থে হাদিস তৈরী
লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ
বন্ধুগণ!
চলুন আজ আমরা এমন এক সত্য নিয়ে আলোচনা করবো —যে সত্য শুনলে বহু মোল্লার গলা শুকিয়ে যায়, বহু ফকিহের দলিল কেঁপে ওঠে, বহু মাজহাবের দেয়াল ভেঙে পড়ে। কারণ আজ আমরা বলবো—মাজহাব ও দলীয় স্বার্থে হাদিস কিভাবে সাজানো হলো, কিভাবে নিজের মত, নিজের আইন, নিজের ফিকহ বাঁচাতে নবীর নামে কথা বানানো হলো। আজ আমরা উন্মোচন করবো সেই ইতিহাস, যেখানে আলিমরা জ্ঞানী নয়—রাজনীতিবিদ ছিলেন, যেখানে ফকিহরা গবেষক নয়—“নিজের মত রক্ষা” দলের সৈনিক ছিলেন।

বন্ধুগণ! কুরআন ঘোষণা করেছিল—
وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِنْ شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ
“তোমরা যে বিষয়ে ভিন্নমত করবে, তার ফয়সালা আল্লাহরই।”
কিন্তু বিদ্রোহীরা প্রশ্ন তুললো—তাহলে আল্লাহর ফয়সালা কোথায়? কুরআন তো আকাশে নয়, মানুষের হাতে ছিল। কিন্তু মানুষ কি করলো? আল্লাহর ফয়সালার বদলে নিজের ফয়সালা চালু করতে শুরু করলো। এটাই ফিকহ, এটাই মাজহাব, এটাই দলীয় মতবাদ।

বন্ধুগণ! যখন চার মাজহাব তৈরি হয়, তখন প্রতিটি দল চাইল—“আমাদের মতই সঠিক, আমরা-ই আল্লাহর দীন ঠিক বুঝেছি।” অথচ কুরআন ঠিক উল্টো কথা বলছিল—
اتَّبِعُوا مَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِنْ رَبِّكُمْ
“তোমাদের রবের পক্ষ থেকে যা নাযিল করা হয়েছে—তা-ই অনুসরণ করো।”
কিন্তু মানুষ বললো—না! আমরা অনুসরণ করবো ইমাম সাহেবকে, ইমাম শাফিঈকে, ইমাম মালেককে, ইমাম আহমদকে, ইমাম আবু হানিফাকে! আর সেই মতবাদ শক্ত করার জন্য শুরু হলো সবচেয়ে ভয়ংকর কাজ—হাদিস তৈরি

বন্ধুগণ! মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন প্রতারণা কমই আছে—যেখানে আল্লাহর বাণীর পাশে মানুষের কথা দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এখানেই শেষ নয়—মানুষের সেই কথাকে “সত্য” বানাতে নবীর নাম ব্যবহার করা হলো! আর কেন করা হলো? কারণ প্রতিটি মাজহাব তাদের অবস্থান পাকা করতে চাইলো।

বন্ধুগণ! ধরুন—এক দল বললো, নামাজে হাত বুকে রাখা সুন্নাহ। আরেক দল বললো নাভির নিচে
এখন সমস্যা হলো—দল দুটো নিজেদের মত প্রমাণ করতে কী করবে? কুরআনে তো নেই।
অতএব তারা মিথ্যা হাদিস বানালো। নবীকে বলালো কিছু কথা।
কেউ বললো—“আমি দেখেছি নবী বুকে হাত রেখেছেন।”
আরেকজন বললো—“নাভির নিচে।”

কিন্তু প্রশ্ন—এই “দেখেছি” বলার লোকরা নবীর মৃত্যুর ১৫০–২০০ বছর পরে কোথা থেকে হঠাৎ এসে দেখা-শোনা করে ফেললো?
বন্ধুগণ! কারণ সোজা— মত রক্ষা → দল রক্ষা → মাজহাব রক্ষা → ব্যবসা রক্ষা
হাদিস তখন ছিল তলোয়ার, ছিল দলগত মোহর

প্রথম দৃশ্য: হানাফিদের “মত রক্ষা” যুদ্ধ
বন্ধুগণ! আবু হানিফা ছিলেন যুক্তিবাদী, স্বাধীন চিন্তার মানুষ। কিন্তু তাঁর ফিকহ রক্ষায় তাঁর অনুসারীরা মরিয়া হয়ে উঠলো। তারা বললো—“যা কিছু আবু হানিফা বলেছেন, সেটাই সর্বোচ্চ।”
তখন প্রশ্ন এলো—এত মত কোথা থেকে এলো?
কুরআন তো অনেক জায়গায় স্বাধীনতা দিয়েছে, নমনীয়তা দিয়েছে, যুক্তি দিয়েছে।
কিন্তু হানাফিরা নিজেদের আইনকে শক্ত করতে চাইল—তাই অনেক “ফযিলত হাদিস” বের হলো।

উদাহরণ:
“উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফকিহ আবু হানিফা।”
ইমামে আজম
এই কথাটি নবী কি সত্যিই বলেছেন?
নবী মারা গেছেন ১ম হিজরিতে, আবু হানিফার জন্ম ৮০ হিজরিতে।
কীভাবে নবী ভবিষ্যতের এক বাচ্চা শিশুকে দেখে তার ফকিহ হওয়া জানলেন?

দ্বিতীয় দৃশ্য: শাফিঈ মাযহাবের প্রতিরোধ
বন্ধুগণ! শাফিঈয়ের অনুসারীরা বললো—“হাদিসই সব। কুরআন তরতাজা—কিন্তু তার ব্যাখ্যা আমাদের ছাড়া হবে না।”
তাই তাদের প্রয়োজন হলো—
নির্দিষ্ট কিছু হাদিস যা তাদের মতকে সমর্থন করে।
ফজর নামাজে কুনুত পড়া কি বাধ্যতামূলক?
শাফিঈরা বললো—“হ্যাঁ।” প্রমাণ? হাদিস!

কিন্তু সেই হাদিস কোথা থেকে?
সংগৃহীত ২০০ বছর পরে।
সনদে এমন নাম—যারা নবীকে দেখা তো দূরের কথা, শুনেছে এমন কাউকেও পাওয়া যায়না!
বন্ধুগণ! এটাই ইতিহাসের নিষ্ঠুর হাসি!

তৃতীয় দৃশ্য: হাম্বলিদের কঠিন ধর্ম তৈরি
বন্ধুগণ! হাম্বলিরা কঠোরতা চেয়েছিল— দীন হবে লোহার মত!
শাস্তি হবে কঠিন! মানুষ ভয়ে থাকবে!
তারা বললো—“নবী কঠোর ছিলেন।”
প্রমাণ?
নিজেদের বানানো কঠিন হাদিস।

কুরআনে আল্লাহ বলেন—
يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ
“আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, কঠিন নয়।”
কিন্তু হাম্বলিরা বললো—“না!! ধর্ম কঠিন হতে হবে!”
তাই তারা বানালো “গজব হাদিস”, “আগুন হাদিস”, “জাহান্নাম হাদিস”— যাতে মানুষ ভয় পায়, কাঁপে, চুপ থাকে।

চতুর্থ দৃশ্য: মালেকিদের “মদিনার আমল” কৌশল
বন্ধুগণ! মালেকিরা বললো—
“মদিনার লোক যা করেছে—সেটাই সত্য।”
অর্থাৎ মদিনার পুরনো রেওয়াজকে ইসলাম বানিয়ে ফেলা হলো!

কিন্তু মদিনার লোকেরা কি ভুল করতে পারে না?
কুরআন তো স্পষ্ট বলেছে—
إِن تُطِيعُوا أَكْثَرَ مَن فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ
“তোমরা সংখ্যাগরিষ্ঠকে অনুসরণ করলে তারা তোমাদের পথভ্রষ্ট করবে।”
কিন্তু মালেকিরা সংখ্যাগরিষ্ঠকে আইন করে ফেললো।
প্রমাণ দিতে লাগলো “আমল হাদিস”।

হাদিস: দলগত যুদ্ধের অস্ত্র
বন্ধুগণ! ইতিহাস বলে—হাদিস কখনো নিরীহ ছিল না।
হাদিস ছিল ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার, ছিল মতবাদের ঢোল
একটি মতবাদ শক্ত করতে হলে প্রয়োজন—দলিল।
দলিল মানেই—“নবী বলেছেন”।
কারণ মানুষ নবীর নাম শুনলে আর কিছু ভাবে না।

ফলে শত শত “মিথ্যা হাদিস ফ্যাক্টরি” তৈরি হলো—
কেউ বানালো রাজনীতির জন্য,
কেউ বানালো ইমামদের লোক দেখানোর জন্য,
কেউ বানালো টাকা রোজগারের জন্য,
কেউ বানালো দলীয় উন্মাদনা বাড়াতে।

একজন বর্ণনাকারী বললো—
“আমি ৪০,০০০ হাদিস মুখস্ত জানি।”
তারপর আরেকজন বললো— “আমি ৭০,০০০!”
আরেকজন বললো— “আমি ৬ লাখ!”
প্রশ্ন: নবীর মুখ থেকে এত কথা বের হয়েছিল কিভাবে?
কুরআন ৬২৩৬ আয়াত— কিন্তু হাদিস লক্ষ লক্ষ!

বন্ধুগণ! নবীর নামে এত কথা বানানো হলো—যা তিনি জীবনে উচ্চারণই করেননি।
এটি ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধ!

“মত রক্ষায় হাদিস” — কয়েকটি বাস্তব উদাহরণ
বন্ধুগণ! আবু হানিফার বিরোধীরা তাঁর বিরুদ্ধে হাদিস বানালো—
“আমার উম্মতের মধ্যে একজন ব্যক্তি থাকবে—যার নাম নু'মান—সে হবে উম্মতের ক্ষতি।”
অর্থাৎ আবু হানিফাকে অপমান করার জন্য হাদিস!

অন্যদিকে হানাফিরা বানালো—
“যিনি কিয়াস ব্যবহার করে ফিকহ ব্যাখ্যা করেন—তিনি আল্লাহর প্রিয়।”

শাফিঈরা বানালো—
“যে আমার সুন্নাহ ধরে না—সে আমার উম্মতের অংশ নয়।”

হাম্বলিরা বানালো—
“আল্লাহ আকাশের উপরে আরশে বসে আছেন”— যেন মানুষ আল্লাহকে শরীরী আকারে কল্পনা করে!
যা কুরআনে কখনো নেই!
বন্ধুগণ! এ সবছিল মত্ রক্ষার অস্ত্র।

কুরআনকে পিছনে ঠেলে দেওয়া—মাজহাবের প্রকৃত উদ্দেশ্য
বন্ধুগণ! কুরআন তো ছিল স্পষ্ট, সহজ, সরল।
আল্লাহ বলেছিলেন—
وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ
“আমি কুরআনকে সহজ করেছি।”

কিন্তু আলেমরা বললো— “না! কুরআন বোঝা খুব কঠিন।”
তারপর বললো— “তাই বাধ্য হয়ে হাদিসের দরকার।”
তারপর বললো— “হাদিসও কঠিন।”
তারপর বললো— “তাই ফিকহ দরকার।”

অতঃপর মানুষ কুরআন ছেড়ে শুরু করলো—
মাজহাব → ফিকহ → কিতাব → বর্ণনা → মতবাদ → দল

কুরআন ছিল পেছনের সিটে।
সামনে ছিল আলেম সাহেব।
বন্ধুগণ! এই বিশ্বাসঘাতকতা না দেখলে আজকের দীন বোঝা অসম্ভব।

বন্ধুগণ! যখন কেউ কুরআনকে সামনে আনতে চাইলো— মাজহাবের সৈন্যরা বললো—
“তুমি বিভ্রান্ত!” “তুমি গোমরাহ!”
“তুমি আহলে আহদিস!” “তুমি রাফেজী!”
“তুমি মুনকারে হাদিস!”

অথচ কুরআন তো বলছে—
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ
“তারা কি কুরআন ভাববে না?”
কিন্তু মাজহাব বলছে—
“ভাববে—কিন্তু আমাদের ব্যাখ্যা মতো ভাববে!”
এটাই দীনকে দল বানানোর ইতিহাস।

বন্ধুগণ! মানুষ আজো ভাবে—হাদিস মানে ইসলামের আসল রূপ।
কিন্তু ইতিহাস বলে—
হাদিস ছিল মাজহাব রক্ষার সিন্দুক,
আর বর্ণনাকারীরা ছিল তালার কারিগর

যে তালা যে দল বানিয়েছে—
সেই তালার চাবি তাদের কাছেই ছিল।
ফলে একেক দল একেক ইসলাম নিয়ে দাঁড়ালো—
হানাফি ইসলাম, শাফিঈ ইসলাম, মালেকি ইসলাম,
হাম্বলি ইসলাম।

কিন্তু কুরআন বলে—
إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ
“দীন কেবল এক—ইসলাম।”
মাজহাব নয়, দল নয়, ফিকহ নয়—
এক আল্লাহর এক দীন!

বন্ধুগণ! আজ আমরা বুঝেছি—
হাদিসের বড় একটি অংশ এসেছে মতবাদ রক্ষার যুদ্ধ থেকে।
যেখানে নবীর নাম ব্যবহৃত হয়েছে—
কখনো রাজনৈতিক স্বার্থে,
কখনো দলগত লড়াইয়ে,
কখনো ফিকহের দাপট দেখাতে,
কখনো নিজের পীর-মাশাইখকে শ্রেষ্ঠ দেখাতে।

কুরআন ছিল আল্লাহর আলো—
কিন্তু লোকেরা আলোকে রেখে দিল,
ধরে নিল অন্ধকারের কথাকে।

বন্ধুগণ! সময় এসেছে—
স্বার্থের তৈরি মিথ্যা হাদিসের পাহাড় ভেঙে
আল্লাহর কুরআনের সামনে দাঁড়ানোর।
কারণ দীন আল্লাহর, নিয়ম আল্লাহর, কথাও আল্লাহর!
মানুষের কথা দীন নয়—
কুরআনই দীন।

Post a Comment

0 Comments

শিয়া সুন্নিদের হাদিস কতগুলো

আমরা শরিয়া আইন চাই, কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া
Chat with us on WhatsApp