আমরা শরিয়া আইন চাই, কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া

 


আমরা শরিয়া আইন চাই, কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া
লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ

এই শব্দ আমাদের শ্লোগান নয়, এটা আমদের রিদয়ের চাওয়া,
যেন শব্দগুলো আগে নিজের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
কারণ শরিয়া কোনো শ্লোগান নয়,
শরিয়া কোনো উত্তেজিত ঘোষণা নয়;
শরিয়া মানে জীবন চালানোর পথ।
কুরআনের শরিয়া মানে এমন এক নীতিব্যবস্থা,
যা মানুষের বিবেক জাগায়, ভয় দেখায় না।
অথচ ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়—
শরিয়ার নাম উচ্চারিত হয়েছে বহুবার,
কিন্তু কুরআনের আত্মা বহুবার হারিয়ে গেছে।

আমরা শরিয়া আইন চাই, কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া
খেলাফতি যুগের শুরুতে মানুষের আশা ছিল প্রবল।
তারা ভেবেছিল—নবীর পরে ন্যায় থাকবে, জুলুম থামবে, কুরআনই হবে মানদণ্ড।
কিছু সময় তা হয়েছিলও।
কিন্তু ধীরে ধীরে, খুব নীরবে,
কুরআনের জায়গায় ঢুকে পড়ে ক্ষমতার হিসাব,
রাজনীতির কৌশল, দরবারি আলেমের ভাষ্য।
শরিয়ার নাম থাকল,
কিন্তু শাসনের কেন্দ্রে কুরআন আর থাকল না—
থাকল শাসকের প্রয়োজন।

আমরা শরিয়া আইন চাই, কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া
প্রথমে বলা হলো—এগুলো শৃঙ্খলার জন্য।
তারপর বলা হলো—এগুলো রাষ্ট্রের স্বার্থে।
এক সময় দেখা গেল—প্রশ্ন করাই অপরাধ।
অথচ কুরআন প্রশ্ন করতে শেখায়, চিন্তা করতে বলে, বিবেককে জাগাতে চায়।
খেলাফতি যুগের বহু পর্বে যারা প্রশ্ন তুলেছিল,
তারা রাষ্ট্রদ্রোহী হয়ে গিয়েছিল—কুরআনের দৃষ্টিতে নয়, ক্ষমতার দৃষ্টিতে।

সাধারণ মুসলমান তখন বুঝতে শুরু করল—
শরিয়ার নামে তার ওপর কর বাড়ছে, অধিকার কমছে, কণ্ঠ রুদ্ধ হচ্ছে।
কুরআনের শরিয়া যেখানে আমানতের কথা বলে,
সেখানে রাষ্ট্রীয় কোষাগার হয়ে উঠল কিছু মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদ।
শরিয়ার নাম উচ্চারিত হতো মসজিদে,
কিন্তু ন্যায় হারিয়ে গেল দরবারে।

বন্ধুগণ!
নারীদের অবস্থানও বদলাতে থাকল।
কুরআন যেখানে তাদের উত্তরাধিকার,
সম্মান ও নিরাপত্তার কথা বলেছে,
সেখানে সংস্কৃতি ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ শরিয়ার নামে তাদের সীমাবদ্ধ করল।
বলা হলো—এটাই দ্বীন।
কিন্তু আসলে তা ছিল দ্বীনের মুখোশে সমাজের ভয় ও নিয়ন্ত্রণ।

এরপর সময় বদলাল, মানচিত্র বদলাল, কিন্তু সমস্যার রং বদলাল না।
আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্রগুলো আবার শরিয়ার কথা বলল—এইবার সংবিধানে, আদালতে, আইনের বইয়ে।
মানুষ আবার আশা করল—এবার বুঝি ন্যায় আসবে।
কিন্তু খুব দ্রুত দেখা গেল—
শরিয়া আছে শাস্তিতে, নেই জবাবদিহিতে।

বন্ধুগণ!
দুর্নীতি চলল রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনের নামে,
ভিন্নমত দমন হলো নিরাপত্তার অজুহাতে।
শাসকের জন্য এক নিয়ম,
সাধারণ মুসলমানের জন্য আরেক নিয়ম।
কুরআনের শরিয়া যেখানে ক্ষমতাবানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়,
সেখানে এই তথাকথিত শরিয়া ক্ষমতাকে রক্ষা করার ঢাল হয়ে উঠল।

এই ব্যবস্থায় কথা বলা মানুষরা হারাতে থাকল স্বাধীনতা। সাংবাদিক, চিন্তাবিদ, আলেম—যারা প্রশ্ন তুলল,
তারা জেল দেখল, নির্বাসন দেখল, জুলুম দেখল।
অথচ কুরআনের শরিয়া তো বলে—
জুলুম দেখলে মুখ খুলতে হবে, নীরবতা ঈমানের দুর্বলতা।

বন্ধুগণ!
এর সঙ্গে যোগ হলো আরেক ব্যথা—দলদলী বিভক্তি।
তরীকা বনাম তরীকা, মাজহাব বনাম মাজহাব, আলেমে আলেমে, দলে আর দলে যুদ্ধ।
সবাই শরিয়ার কথা বলে, কিন্তু কুরআনের ঐক্যের আয়াত কেউ শোনে না।
কুরআন যেখানে এক উম্মাহর কথা বলেছে,
সেখানে তারা বানিয়েছে অসংখ্য শিবির, অসংখ্য দেয়াল।

মানুষ তখন বিভ্রান্ত হয়।
সে দেখে—এক আলেম এক কথা বলে, আরেক আলেম সম্পূর্ণ বিপরীত।
এক তরীকা অন্য তরীকাকে বাতিল করে,
এক মাজহাব অন্য মাজহাবকে সন্দেহের চোখে দেখে। সাধারণ মুসলমান তখন প্রশ্ন করে—
তাহলে কুরআন কোথায়?
কিন্তু সেই প্রশ্নটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

বন্ধুগণ!
তাহলে কি শরিয়া আইন সমস্যা?  না!
তাহলে কি শরিয়া শব্দে সমস্যা?  না!
তাহলে সমস্যা কোথায়?
ভাই, সমস্যা শরিয়া শব্দে নয়,
সমস্যা হলো শরিয়া নিবেন কোথা থেকে?
সমস্যা হলো শরিয়া নিবেন কার থেকে?
আপনার শরিয়ার উৎস কোথায়?
আপনার শরিয়ার উৎস কি কুরআন? 
নাকি হানাফি, শাফেয়ী ল,
নাকি হাম্বলী, মালেকি ল,
নাকি ওহাবী, সৌদিয়ান ল,
নাকি তালেবানি, আফগানী, পাকিস্তানি ল,

আমরা শরিয়া আইন চাই, কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া
কুরআনের শরিয়া মানুষকে এক করে,
আর মানুষের বানানো শরিয়া মানুষকে ভাগ করে।
একটাতে ন্যায়বিচার কায়েম হয়,
আরেকটাতে শাষকের ক্ষমতা কায়েম হয়।
যুগের পর যুগে শরিয়ার নাম উচ্চারিত হয়েছে ইবাদতের মতো,
কিন্তু বাস্তবতায় সাধারণ মুসলমানের জীবন খুব কমই সহজ হয়েছে।
কৃষক তার জমি হারিয়েছে,
শ্রমিক তার মজুরি হারিয়েছে,
আর দরবারে বসে থাকা লোকেরা বলেছে—
এটাই আল্লাহর বিধান।
কিন্তু কুরআনের কোথায় লেখা আছে যে শাসকের বিলাস আল্লাহর ইবাদত?

আমরা শরিয়া আইন চাই,
একশবার চাই,
কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া
কিন্তু হুজুর আমরা আপনাকে বিশ্বাস করতে পারছিনা,
আপনি মুখে বলছেন কুরআনের শাষন কায়েম করবেন।
কিন্তু বাস্তবে দেখি আপনি কুরআন বিশ্বাসই করেননা।
কুরআনে হাতরাইয়া আপনি কিছুই পাননা,
কুরআন দিয়ে নাকি আপনি অজুও করতে পারেননা।
তাহলে আপনি কোন শরীয়া চান,  বুঝিনা

আমরা শরিয়া আইন চাই,
হাজারবার চাই,
কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া
কিন্তু হুজুর আমরা আপনাকেতো ভরসা করতে পারছিনা,
আপনি বলে বেড়াচ্ছেন, যে শুধু কুরআন মানে সে কাফের
আপনি বলছেন, যে কুরআন মানে সে পথভ্রষ্ট,
আবার একই মুখে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতে চান,
বুঝিনা আপনি পাগল হলেন!
নাকি আমাদের বোকা বানাচ্ছেন। 
আপনি হানাফি হুজুর হলে আহলে হাদিসকে কাফের বলছেন,
আপনি আহলে হাদিস হলে হানাফিদের বিদাতি বলছেন,
টংগীর জামাতকে হত্যা করলে নাকি অঢেল নেকি,
মুসলমানরাইতো আপনার থেকে নিরাপদ নয়,
অমুসলিমরা কি দেশে থাকতে পারবে?
বুঝিনা আপনি কোন শরিয়া প্রতিষ্ঠা করবেন?

আমরা শরিয়া আইন চাই,
হাজারবার চাই,
কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া,
আপনি বলছেন,  কোরআনে শুভংকরের ফাঁকি,
আপনি বলছেন কোরআনে দর্শনের গলদ আছে,
আপনি বলছেন কোরআন শাষণ করতে পারেনা,
আবার সেই আপনিই কিভাবে শরীয়া আইন চান,

এটা কোন শরিয়া,  জাতি তা জানতে চায়,
আমরা বুঝতে পারছি সেটা আর যাইহোক কোরানের শরিয়া নয়,
কোরানের শরীয়া মসজিদ আলাদা করেনা,
কোরানের শরীয়া ভিন্নমতকে গালি দেয়না,
কোরানের শরিয়া ভিন্নমতকে কথা বলার সাধীনতা দেয়,
কোরানের  শরিয়া ভিন্নমতের ইবাদতখানায় হামলা করেনা,

আমরা শরিয়া আইন চাই,
হাজারবার চাই,
কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া,
বন্ধুগণ! ইতিহাস থেকে আমরা দেখতে পেয়েছি, 
শুরুতে শাসনব্যবস্থা নিজেকে ধর্মীয় দায়িত্ব বলে উপস্থাপন করেছে।
বলা হয়েছে—শাসকের আনুগত্য মানেই দ্বীনের আনুগত্য।
খুব ধীরে ধীরে মানুষ এই কথায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলো।
কুরআনের আয়াত তখন আর মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায় না,
বরং মানুষকে চুপ থাকতে শেখানো হয়েছিলো।
শরিয়া তখন আল্লাহর পথ নয়,
শাসকের ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।

এখানেই সাধারণ মুসলমান সবচেয়ে বড় ক্ষতির স্বীকার হয়েচিলো ।
সে জানে—কুরআন ন্যায় চায়, কিন্তু সে ন্যায় পায়নি।
সে জানে—কুরআন জুলুমের বিরুদ্ধে,  কিন্তু সে জুলুমের শিকার হয়েছে ।
তখন সে দ্বিধায় পড়ে যায়—
সে কি আল্লাহর বিরুদ্ধে যাচ্ছে প্রশ্ন করে,
নাকি মানুষের বিরুদ্ধে যাচ্ছে চুপ থেকে?
এই দ্বিধাই কুরআনবিহীন শরিয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর ফল।

বন্ধুগণ!
এখন আমরা আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকাই, খুব গভীরভাবে।
কারণ এখানেও প্রথমে আশা ছিল।
সংবিধানে শরিয়ার নাম লেখা হলো, আদালতে কুরআনের আয়াত ঝুলল,
বক্তৃতায় ইসলামের কথা বলা হলো।
সাধারণ মানুষ ভাবল—এবার বুঝি শাসক আল্লাহকে ভয় করবে।
কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই দেখা গেল—আল্লাহর ভয় নয়,
ভয়টা রয়ে গেছে জনগণের কণ্ঠের।

আমরা শরিয়া আইন চাই, কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া
আধুনিক তথাকথিত শরিয়া ব্যবস্থায় শাস্তি দ্রুত, 
কিন্তু ন্যায় ধীর।
দুর্বল মানুষ আইন পায় তৎক্ষণাৎ,
শক্তিশালী মানুষ পায় সময়, প্রভাব আর সমঝোতা।
কুরআনের শরিয়া যেখানে সাক্ষ্য, প্রমাণ ও ন্যায়কে সমানভাবে বিবেচনা করে,
সেখানে এই ব্যবস্থাগুলো ক্ষমতার ভারসাম্য দেখে সিদ্ধান্ত নেয়।

আমরা শরিয়া আইন চাই, কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া
এখন একটু স্পষ্ট হয়ে যায়—
মানব রচিত শরিয়া মানুষের আচরণ বদলায় না,
শুধু মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে।
দুর্নীতি থাকে, শুধু নাম বদলায়।
জুলুম থাকে, শুধু বৈধতার পোশাক পরে।
কুরআনের শরিয়া যেখানে মানুষকে আমানতদার বানায়,
সেখানে এই ব্যবস্থাগুলো মানুষকে ভীতু নাগরিকে পরিণত করে।

এই রাষ্ট্রগুলোতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে সত্য কথা বলা মানুষ।
কেউ আয়াতের আলোয় প্রশ্ন তুললে তাকে বলা হয়—
তুমি রাষ্ট্রবিরোধী।
কেউ ন্যায় চাইলেই তাকে ফিতনাবাজ বলা হয়।
অথচ কুরআনের চোখে ফিতনা হলো জুলুমকে টিকিয়ে রাখা, প্রশ্ন করাকে দমন করা নয়।

আমরা শরিয়া আইন চাই, কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া
আমরা এমন শরিয়া আইন চাইনা,
যেখানে শরিয়ার নামে আইন থাকলেও নারীর অধিকার থাকে সীমিত।
শিক্ষা, কাজ, মতপ্রকাশ—সবই অনুমতির অধীনে।
কুরআন যেখানে নারীকে দায়িত্ববান মানুষ হিসেবে দাঁড় করায়,
সেখানে এই ব্যবস্থায় তাকে “সমস্যা” হিসেবে দেখা হয়।
এমনটি হলে তা কুরআনের শরিয়া নয়, এটা ক্ষমতার ভয়।

এরপর আসে দলাদলি।
রাষ্ট্রের ভেতরে দল, দলের ভেতরে উপদল, উপদলের ভেতরে শত্রুতা।
শরিয়ার প্রশ্নে একমত হওয়ার কথা ছিল,
কিন্তু সবাই ব্যস্ত নিজের ব্যাখ্যা বাঁচাতে।
তরীকা তরীকাকে সন্দেহ করে,
মাজহাব মাজহাবকে বাতিল করে,
আলেম আলেমকে কাফের পর্যন্ত বলতে দ্বিধা করে না। সাধারণ মুসলমান তখন আর জানে না—কোনটা আল্লাহর পথ, কোনটা মানুষের যুদ্ধ।

বন্ধুগণ!
এই বিভক্তির ভেতরে কুরআন হারিয়ে যায়।
আয়াত আর পথনির্দেশ হয় না, হয় অস্ত্র।
মানুষ কুরআন পড়ে প্রতিপক্ষকে আঘাত করার জন্য, নিজেকে সংশোধনের জন্য নয়।
কুরআনের শরিয়া যেখানে এক করে,
সেখানে এই ব্যবস্থাগুলো বিভক্তিকে পুঁজি করে টিকে থাকে।

ধীরে ধীরে বোঝা যায়—
খেলাফতি যুগ হোক বা আধুনিক রাষ্ট্র, সমস্যা এক জায়গায়।
শরিয়ার উৎস কুরআন না হলে,
ফলাফল কখনো ন্যায় হয় না।
তখন শরিয়া ক্ষমতার হাতিয়ার হয়,
ধর্ম হয়ে ওঠে শাসনের ভাষা,
আর সাধারণ মুসলমান পরিণত হয় নীরব দর্শকে।

বন্ধুগণ!
এখন প্রশ্ন আর নীরব থাকে না।
যদি শরিয়ার নামে মুসলমানই সবচেয়ে বেশি শোষিত হয়,
তাহলে সেই শরিয়া কার?
যদি শরিয়ার নামে প্রশ্ন নিষিদ্ধ হয়,
তাহলে কুরআনে কোথায় সেই নিষেধ?
যদি শরিয়ার নামে বিভক্তি বাড়ে,
তাহলে কুরআনের ঐক্যের ডাক কোথায় গেল?

বন্ধুগন
চলো আজ নিজেকে প্রশ্ন করি,
কারণ ইতিহাসকে দোষ দেওয়া সহজ,
রাষ্ট্রকে দোষ দেওয়া সহজ, 
শাসককে দোষ দেওয়া সহজ—
কিন্তু প্রশ্নটা শেষ পর্যন্ত আমাদের কাছেই ফিরে আসে। আমরা কি সত্যিই কুরআনের শরিয়া চেয়েছি,
নাকি আমরা চেয়েছি আমাদের মাজহাবি পরিচয়?
আমাদের দল শক্ত থাকে,
আমাদের মতটাই শেষ কথা হয়?

আমরা শরিয়া আইন চাই,
লক্ষবার চাই,
কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া,
কুরআনের শরিয়া প্রথমেই মানুষের ভেতরের রাজত্ব ভেঙে দেয়।
সে বলে—হুকুম একটাই, সার্বভৌমত্ব একটাই।
এখানে কোনো আলেম, কোনো শাসক,
কোনো তরীকার পীর আল্লাহর জায়গা নিতে পারে না।
কিন্তু আমরা কী করেছি?
আমরা আল্লাহর হুকুমকে সম্মান করেছি মুখে,
আর বাস্তবে বানিয়েছি ধর্মজীবীদের সাম্রাজ্য।

এখানেই সবচেয়ে বড় সংঘাতটা শুরু হয়।
কুরআনের শরিয়া মানুষকে সমান করে—
শাসক ও শাসিত, আলেম ও সাধারণ, পুরুষ ও নারী।
কিন্তু মানুষের বানানো শরিয়ায় স্তর তৈরি হয়।
কে প্রশ্ন করতে পারবে, কে পারবে না;
কে ব্যাখ্যা দেবে, কে শুধু শুনবে।
এই বৈষম্য কুরআনের নয়, এটা ক্ষমতার।

আমরা শরিয়া আইন চাই,
হাজার বার চাই,
কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া
যদি কুরআনের শরিয়া বাস্তবেই চালু হতো,
তাহলে প্রথমেই ভাঙত দলাদলীর দেয়াল।
কারণ কুরআন মানুষকে পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়,
ন্যায়ের ভিত্তিতে দাঁড় করায়।
সেখানে মাজহাব পরিচয় নয়,
তরীকা পরিচয় নয়—আমানতদারির পরিচয়।
কিন্তু আমরা পরিচয়কে ইমানের মাপকাঠি বানিয়েছি,
আর ন্যায়কে বানিয়েছি বিতর্কের বিষয়।

আমরা শরিয়া আইন চাই,
কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া
কুরআনের শরিয়া আলেমকে ক্ষমতার অংশ বানায় না,
বরং তাকে দায়িত্বের জায়গায় দাঁড় করায়।
সেখানে আলেম মানে সত্যের সাক্ষী,
দরবারের মুখপাত্র নয়।
কিন্তু ইতিহাসে আমরা দেখেছি—
আলেমে আলেমে বিরোধ,
ফতোয়ায় ফতোয়ায় যুদ্ধ,
আর সাধারণ মুসলমান দাঁড়িয়ে থাকে বিভ্রান্তির মাঝখানে। এই বিশৃঙ্খলা কুরআনের নয়,
এটা মানুষের বানানো কাঠামোর ফল।

আমরা শরিয়া আইন চাই,
কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া
যদি কুরআনের শরিয়া হতো রাষ্ট্রের ভিত্তি,
তাহলে আইন শুধু শাস্তির জন্য ব্যবহার হতো না।
আগে প্রশ্ন উঠত—এই ব্যবস্থায় দুর্বল নিরাপদ কি না,
মজলুম আশ্রয় পাচ্ছে কি না।
কুরআনের শরিয়া আগে জিজ্ঞেস করে—
জুলুম বন্ধ হলো কি না। কিন্তু আমরা উল্টো পথে হেঁটেছি—শাস্তিকে প্রদর্শনী বানিয়েছি, ন্যায়কে পিছনে ঠেলে দিয়েছি।

আমরা শরিয়া আইন চাই,
কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া
কুরআনের শরিয়ায় ভিন্নমতের শত্রু নয়।
কারণ কুরআন জানে—সত্য ভয় পায় না।
কিন্তু আমাদের তথাকথিত শরিয়া ব্যবস্থায় ভিন্নমত মানেই হুমকি।
এই ভয় আসলে কুরআনের ভয় নয়,
এটা ক্ষমতা হারানোর ভয়।

এখানে এসে স্পষ্ট হয়ে যায়—খেলাফতি যুগের ব্যর্থতা, আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর ব্যর্থতা,
দলাদলি আর বিভক্তির মূল কারণ একটাই।
আমরা কুরআনকে মানদণ্ড না বানিয়ে তাকে ব্যবহার করেছি। কখনো বৈধতার জন্য,
কখনো আবেগের জন্য,
কখনো প্রতিপক্ষকে চেপে ধরার জন্য।

আমরা শরিয়া আইন চাই,
কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া
কুরআনের শরিয়া কোনো দলের সম্পত্তি নয়।
সে কোনো বিপ্লবী পোস্টারও নয়,
কোনো রাষ্ট্রীয় স্লোগানও নয়।
সে এমন এক নীতিপথ,
যা প্রথমে মানুষকে বদলায়, তারপর সমাজকে।
তাই যারা শরিয়ার কথা বলে কিন্তু নিজেদের দুর্নীতি, অহংকার,
দলান্ধতা স্পর্শ করতে দেয় না—
তারা কুরআনের শরিয়া চায় না, তারা নিরাপদ কর্তৃত্ব চায়।

এই জায়গায় এসে আর লুকানোর কিছু থাকে না।
যদি আমরা সত্যিই কুরআনের শরিয়া চাই,
তবে আমাদের ছাড়তে হবে অন্ধ আনুগত্য,
ছাড়তে হবে দলীয় শ্রেষ্ঠত্বের নেশা,
ছাড়তে হবে আলেমে আলেমে যুদ্ধের রাজনীতি।
কুরআন এক জাতি বানাতে চেয়েছিল—
আমরা তাকে টুকরো করেছি।

আমরা শরিয়া আইন চাই,
কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া
এই শরিয়া চাইলে প্রথমেই আমাদের নিজেদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
প্রশ্ন করতে হবে—
আমরা কি কুরআন পড়ি নিজেদের সংশোধনের জন্য,
না অন্যকে হারানোর জন্য?
আমরা কি কুরআনের আয়াত শুনে নত হই,
না নিজের অবস্থান রক্ষা করতে ব্যাখ্যার দেয়াল তুলি?

এখন আর সময় নেই অজুহাতের।
ইতিহাস আমাদের সামনে,
বর্তমান আমাদের চোখের সামনে।
কুরআনের বাইরে গিয়ে বানানো প্রতিটি শরিয়া শেষ পর্যন্ত মুসলমানকেই আঘাত করেছে।
এই সত্য এড়িয়ে যাওয়ার আর কোনো পথ নেই।

আমরা শরিয়া আইন চাই,
কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া
এই কথাটা তাই কোনো শ্লোগান নয়।
এটা একটি দায়। এটা একটি ঘোষণা—
আমরা আর মানুষের বানানো ধর্ম চাই না।
আমরা সেই শরিয়া চাই,
যেখানে আল্লাহর হুকুমই শেষ কথা,
আর মানুষ কেবল আমানতদার।

এখন সিদ্ধান্তের সময়।
তুমি কি নিরাপদ বিভক্তির ভেতর থাকবে,
নাকি কুরআনের ঐক্যের পথে হাঁটবে?
তুমি কি পরিচয়ের শরিয়া মানবে,
নাকি ন্যায়ের শরিয়া গ্রহণ করবে?
কারণ কুরআনের শরিয়া কাউকে জোর করে ধরে রাখে না—সে শুধু পথ দেখায়।

আমি বক্তব্য এখানেই শেষ করলাম,
কিন্তু প্রশ্নটা রেখে গেলাম।
প্রশ্নটা তোমার বিবেকের কাছে থাকলো।
তুমি কোনটা বেছে নেবে—মানুষের বানানো শরিয়া,
নাকি কুরআনের শরিয়া?




Post a Comment

0 Comments

শিয়া সুন্নিদের হাদিস কতগুলো

আমরা শরিয়া আইন চাই, কিন্তু তা হবে কুরআনের শরিয়া
Chat with us on WhatsApp