▶️ পীরতন্ত্রের আজব লীলা। আবু তাহের বর্ধমানী।


পীরতন্ত্রের আজবলীলা

পীর শব্দের তাৎপর্য

যে পীর পীর করে আমরা এতো পাগল, সেই পীর শব্দটা কিন্তু আরবী শব্দ নয়। আর ওটা পবিত্র কুরআন ও হাদীসের পরিভাষারও কোন শব্দ নয়। পীর শব্দটা ফারসী শব্দ। মানুষের বয়স বেশী হয়ে গেলে সেই বুড়োবুড়ি মানুষকে বলা হয় পীর। পারস্যের অগ্নি পূজারীদের পুরোহিতকে বলা হয় 'পীরে মুগাঁ'।

 ফারসী অভিধানে 'পীরে মুগাঁর' অর্থ করা হয়েছে- 'আতাশ পোরকুঁকা মুরশেদ' অগ্নি পূজারীদের পুরোহিত। মদের আড্ডায় যিনি মদ বিক্রয় করেন, সেই গুঁড়ি মহাশয়কে বলা হয় পীরে মুগাঁ। মুসলমানদের কোন ইমাম, খতীব, নায়েবে নবী বা নেতার শানে এই পীর শব্দটাকে ব্যবহার করতে হবে, এ প্রমাণ কুরআন ও হাদীসে মিলে না। তবে কেউ কেউ আধ্যাত্মিক প্রেমকে রূপকভাবে মদরূপে অভিহিত করে, সেই প্রেমরস পরিবেশনকারীকে পীরে মুগাঁ বা গুঁড়ি মশায় বলে অভিহিত করেছেন যেমন:

বমায়ে শাজ্জাদাহ্ রঙ্গীন কুন

গিরাত পীরে মুগাঁ গোয়াদ

সে সালেক বেখবর নাবুদ 

যে রাহে রাসমো মানযালহা।

পীর মুগাঁ অর্থাৎ শুঁড়ি মশায় যদি বলেন, তাহলে তুমি জায়নামাযকে মদের দ্বারা রাঙিয়ে তুলো। কেননা পথের সন্ধান গুরুজী ভালভাবেই অবগত আছেন। এই কবিতার শুঁড়ি মশায়কে 'পীরে মুগাঁ' বলা হয়েছে।

 খৃষ্টানদের Priest আর হিন্দুদের পুরোহিত বলতে যা বুঝায়, পীর বলতে ঠিক তাই বুঝায়। পীর পুরোহিত বা Priest এর কোন প্রতিশব্দ কুরআন হাদীসে নেই। আবূ বকর, উমার, উসমান, আলী (রাযি.) প্রমুখ সাহাবীগণও কেউ কোনদিন পীর বলে দাবী করেননি। 

তাবিয়ীনদের যুগে পীরের অস্তিত্ব ছিল না। ইমাম আবু হানীফা, ইমাম শাফিয়ী, ইমাম মালিক, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল, ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম আবূ দাউদ, ইমাম নাসায়ী, ইমাম তিরমিযী, ইমাম ইবনু মাজাহ (রহ.) প্রভৃতি মহামতি ইমামগণও পীরগিরি করেননি। কোন্ কুক্ষণে পারস্যের অগ্নি পূজারীদের সেই পীর তওহীদবাদী মুসলিম সমাজের ঘাড়ে-গর্দানে জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসল- তা ভেবে কুল পাওয়া যায় না।

আরবী ভাষায় উসতায ও নেতাকে শাইখ বলা হয়। পীরি-মুরীদির শাস্ত্রে কেউ কেউ এ শাইখ শব্দটাকে পারস্যের অগ্নি পূজারীদের পীরের সমঅর্থবোধক বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তওহীদবাদী মুসলমানদের উসতায ও নেতাকে আর অগ্নি পূজকদের পুরোহিতকে এক গোয়ালে পুরে দেয়া কেমন করে হালাল হয়ে গেল- বুঝলাম না।

আমাদের দেশে নানা ধরনের পীর দেখা যায়। সব পীরের যে দাবী এক- তা নয়। তবে অধিকাংশ পীরের দাবী হচ্ছে ঠিক হিন্দুদের পুরোহিতদের মতই। পুরোহিত ও যাজকরা সব সময় হিন্দু জাতির সামনে থাকেন। পূজা-পার্বন, যাগ-যজ্ঞ ও শ্রাদ্ধ প্রভৃতির একচেটিয়া মালিক তারাই। তারা ছাড়া এ সবের অধিকার আর কারো নেই।

 তারা মানুষ আর সৃষ্টিকর্তার মাঝে মাধ্যম বা 'ওসীলা' স্বরূপ। সৃষ্টিকর্তার কাছে সরাসরি মানুষ যেতে পারে না, তাই এ 'Edditional God' এর কাছে তাদেরকে যেতে হয়। পুরোহিত না হলে পূজা অর্চনা হয় না, মনের বাসনা পুরা হয়না, পাপমুক্ত হওয়া যায় না। পুরোহিত বা 'Edditional God' যার আছে তার সবই আছে, আর যার পুরোহিত নেই তার মত হতভাগা আর কেউ নেই। এই পুরোহিতরাই গুরুদেব নামে আখ্যায়িত হয়ে থাকেন।

 কারণ মন্ত্র পড়ান এই গুরুদেব, শিক্ষা দেন এই গুরুদেব, ভক্তের পাপমোচন করে দেন এই গুরুদেব, ভক্তের যাবতীয় মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন এই গুরুদেব। ভক্ত শত অপরাধে অপরাধী হোক, শম্ভু হয়ে তার শত অপরাধ নাশ করে দিয়ে স্বয়ং ভগবানকে দেখিয়ে দেন এই গুরুদেব।

🛟

প্রশ্নঃ- পীর কি ধরতেই হবে? একজনকে পীর মানা 

কতটুকু জরুরী?

🛟

বলাবাহুল্য, পুরোহিত তন্ত্র বা গুরুবাদ হিন্দু সমাজের যে অবস্থা ঘটিয়েছে, পীরতন্ত্র ঠিক সেরূপ মুসলিম সমাজের অবস্থা ঘটিয়েছে। কারণ পীরের দাবী পুরোহিতদের দাবীর চেয়ে কোন অংশে কম নয়। পীররাও বান্দা আর আল্লাহর মাঝখানে নিজেদেরকে মাধ্যম বা 'ওসীলা' বলে দাবী করেন। তাঁর মুরিদ-মুরীদ্ধি বানান; তাঁরা ভক্তদের গোনাহখাতা নাশ করে পাপমুক্ত করেন, তাঁদের অনেকেই পরকালে মুরীদদেরকে বেহেশতে পৌছে দেয়ার 'গ্যারান্টি' দিয়ে থাকেন; অনেকে আবার ভক্তদেরকে আল্লাহর সঙ্গে দেখাও করিয়ে দেন; ইসমাঈলিয়াদের পীর আগাখান তো এখানে বসেই বেহেশতের পাসপোর্ট ভিসা দিয়ে থাকেন। তাহলে এখানে পুরোহিত ও পীর সবাই যে একই পথের পথিক তাতে আর সন্দেহ থাকলো কোথায়?

পীর দাবী করা ঠিক নয়

ইসলামী শারা শরীয়ত মতে পীর পুরোহিতদের দাবীগুলো ঠিক নয়। কারণ মানুষের পাপমোচন করার অধিকার কোন পীরকে দেয়া হয়নি। পাপ নাশ করার শক্তি কোন মানুষের নেই, কোন ফেরেশতার নেই, কোন জ্বিনের নেই, কোন ওলী-দরবেশের নেই। পাপমোচনের একমাত্র অধিকারী মহান আল্লাহ।

সূরা আলে-ইমরানের ১৩৫ আয়াতে আছে.

"কোন ঈমানদার মুসলমান যখন কোন পাপ কাজ করে বসে, তখন তারা আল্লাহর কাছেই ক্ষমা চায়, কেননা আল্লাহ ছাড়া গোনাহ্ খাতা মাফ কে করতে পারে?"

উস্কে দাৰ্জে কো পুহুচ্ সাক্তে নেহী গওস্ ও কুতুব

জিন্দেগী মে জিনে পায়ী সহবতে খায়রুল ওরা।

জীবনে যাঁরা প্রিয় রসূল-এর সাহচর্য লাভ করেছেন, তথাকথিত গওস্ ও কুতুবরা তাঁদের দরজায় পৌঁছতে পারে না। এহেন মহাসম্মানিত নিজের রসূলকেও আল্লাহ তা'আলা পাপমোচনের অধিকার দেননি। সূরা আন-নিসার ৬৪ আয়াতে বলা হয়েছে-

‎‫وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ‬‎

‎‫الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَّحِيمًا*‬‎

"পাপীরা যদি রসূলের কাছে এসে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় আর রসূলও যদি তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান, তাহলে আল্লাহকে তারা ক্ষমাশীল করুণাময়রূপে পাবে।" এ থেকে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে, পাপমুক্ত করার শক্তি রসূলকে দেয়া হয়নি। এবার হিদায়াত করার কথা। হিদায়াত করার শক্তি পীরতো দূরের কথা, আল্লাহর রসূলও পাননি। সূরা আল-কাসাসের ৫৬ আয়াতে আল্লাহ তাঁর নবীকে বলেছেন-

‎‫إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ أَعْلَمُ‬‎

‎‫بِالْمُهْتَدِينَ *‬‎

"আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না, তবে আল্লাহ তা'আলাই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন। কে সৎপথে আসবে, সে সম্পর্কে তিনিই ভাল জানেন।"

মোট কথা পাপমোচনের দাবীও পীর সাহেবদের মিথ্যা, আর হিদায়াত করার দাবীও পীর সাহেবদের অমূলক। কোন কোন পীর সাহেব ভক্তদের পাপের বোঝা বহন করবেন বলে সান্ত্বনা বা 'গ্যারান্টি' দিয়ে থাকেন। তাঁদের এ দাবীও পীরগিরি বহাল রাখার এক ফন্দি ছাড়া আর কিছু না।

কুরআনে সূরা আনকাবুত ১২ নং আয়াতে আছে

"কাফিররা মুমিনদেরকে বলতো আমাদের পথে চল, আমরা তোমাদের পাপের বোঝা বহন করব। কিন্তু তারা তাদের একটুমাত্র বোঝাও বহন করার শক্তি রাখে না; তারা মিথ্যুক, তারা ধোঁকাবাজ।

মুসলিম শরীফের একটি হাদীসে পাওয়া যায়, আল্লাহর রসূল নিজের বংশের সকলকে আর বিষেশ করে সুফিয়া (রাযি.)-কে ও আপন মেয়ে ফাতিমা (রাযি.)-কে ডেকে বলেছিলেন, তোমরা আল্লাহর কাছ থেকে নিজেদেরকে মুক্ত কর। কেননা তোমাদেরকে উদ্ধার করার ব্যাপারে আমি তোমাদের কোনই কাজে লাগব না। হে বেটি ফাতিমা! এখন আমার মাল থেকে যা ইচ্ছে নিতে পার, কিন্তু জেনে রাখ আল্লাহর কাছে আমি তোমার কোনই কাজে লাগব না।

পাঠক এখানে লক্ষ্য করুন- যিনি সৃষ্টির সেরা, যিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, সেই প্রিয় রসূল মুহাম্মদ মোস্তফা যদি কিয়ামতের দিন নিজের মেয়ে ফাতিমার দোষ-ত্রুটির দায়িত্ব গ্রহণ করতে অক্ষমতা প্রকাশ করেন, তাহলে কোন্ সাহসে এক শ্রেণীর পীর-নামধারী গুরুদেব কিয়ামতের মাঠে ভক্তদের পাপের বোঝা বহন করার স্পর্ধা দেখাতে পারে বুঝতে পারি না।

ওসীলা হওয়ার দাবীও ভিত্তিহীন

পীরদের আর এক দাবী হল, তাঁরা জনগণকে সম্বোধন করে বলেন, আদালতে ইষ্ট সিদ্ধির জন্য যেমন উকিল মোক্তারের দরকার, ঠিক তেমনি তোমরা সংসারের ক্ষুদ্র কীট, সরাসরি আল্লাহর কাছে যেতে পারবে না। আল্লাহর কাছে যেতে গেলে ওসীলা বা মাধ্যম তোমাদেরকে ধরতেই হবে, আর সেই মাধ্যম বা উকিল মোক্তার হচ্ছি আমরা এই পীরের দল।

পীরদের এ দাবীও ভিত্তিহীন। কারণ যে আল্লাহ প্রেমময়-বান্দার অন্তরের অন্তঃস্থলের যাবতীয় খবর রাখেন, যে আল্লাহ বান্দার আকুল ফরিয়াদ সরাসরি শ্রবণ করতে সক্ষম, সেই আল্লাহকে দুনিয়ার সংকীর্ণ দৃষ্টি, সসীম জ্ঞান, একেবারে অক্ষম বিচারকদের সাথে তুলনা করে পীরদের উকিল মোক্তার সাজার দাবীটা শির্ক ছাড়া আর কি হতে পারে?

আয়াতে বলা হয়েছে- 

وَيَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ‎

‎‫شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ اللَّهِ قُلْ أَتُنَبِّئُونَ اللَّهَ بِمَا لَا يَعْلَمُ فِي السَّمَوتِ وَلَا في الْأَرْضِ سُبْحْنَهُ وَتَعْرَى *

 তারা এমন কিছু বস্তুর পূজায় লিপ্ত রয়েছে, তারা তাদের লাভ ও‬‎ ক্ষতি কিছুই করতে পারে না, আর এই অপকর্মের কৈফিয়ত স্বরূপ তারা বলে থাকে, ওরা আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য সুপারিশকারী মাত্র।'

কুরআনে সূরা আয-যুমারের তৃতীয় আয়াতে বর্ণিত আছে-

‎‫الا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرٌ بُونَا إِلَى * اللَّهِ ...‬‎

"উপাসনাকে শুধু আল্লাহর জন্য নির্ধারিত কর। যারা আল্লাহকে ছেড়ে আরও পৃষ্ঠপোষকের দল গ্রহণ করেছে, তারা বলে থাকে আমরা ওদের পূজা অর্চনা শুধু এই আশাতে করি যে, তারা 'ওসীলা' হয়ে আমাদেরকে আল্লাহর কাছে পৌঁছে দিবে।"

কোন কোন পীরভক্ত হয়তো এখানে বলবেন, মুরীদরা কি পীরের পূজা উপাসনা করে নাকি? অবশ্য এরূপ প্রশ্ন আদি বিনে হাতিম আল্লাহর রসূল -কে করেছিলেন। একদিন আল্লাহর রসূল কুরআনের সূরা তাওবার ৩১ নং আয়াতটি পাঠ করছিলেন-

‎‫اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ رُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ *

 "ইয়াহুদী আর খৃষ্টানরা তাদের পণ্ডিত পুরোহিতদেরকে আল্লাহর পরিবর্তে রব বানিয়ে নিয়েছে।"‬‎

এমন সময় খৃষ্টান পণ্ডিত আদি বিনে হাতিম সেখানে হাজির হয়ে বললেন, কই আমরা তো তাদের পূজা অর্চনা করি না। আল্লাহর রসূল তখন বললেন, আল্লাহ যা হালাল করেছেন, সেগুলোকে যদি তারা হারাম বলে ঘোষনা করে, তাহলে তোমরা কি সেই হালালকে হারাম বলে গ্রহণ কর না? আর আল্লাহ যা হারাম করেছেন, সেগুলোকে যদি তারা হালাল বলে ফতোয়া দেয়, তাহলে তোমরা কি সেই হারামকে হালাল বলে স্বীকার কর না? আদি বললেন, জী হাঁ। আল্লাহর রসূল বললেন, এটাই হচ্ছে তাদের পূজা অর্চনা করা। (ইবনু জারীর)

মোটকথা, আল্লাহ কোন মানুষকে পাপমুক্ত করার শক্তি, হিদায়াত করার শক্তি, দেহ ও মনের পবিত্রতা সাধন করার শক্তি পাপের বোঝা বহন করার শক্তি এবং আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে উকালতি করার শক্তি দেননি। 

এখন যদি কেউ বলে, মানুষ মেরেছি, দুর্নীতি করেছি, গুণ্ডামী করেছি, লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছি, গাড়ি বাড়ি করেছি, পর্বত প্রমাণ গুনাহর বোঝা হয়েছে, চতুর্দিক অন্ধকার। আমাকে বাঁচাবে কে- আমার ঐ পীর; আমাকে হিদায়াত করবে কে- আমার ঐ পীর; উকালতি করবে কে- আমার ঐ পীর। তাহলে এটাই হবে পীরের পূজা করা।

পূর্বেই বলেছি, পীর বা পুরোহিতের অস্তিত্ব ইসলামে নেই। ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় প্রত্যেক মুসলমান স্বয়ং তার পুরোহিত। প্রত্যেক মুসলমানকে মহান আল্লাহর সাথে সরাসরি আধ্যাত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ বলেছেন- 'রাজা ও প্রজাদের মধ্যে যেমন মধ্যস্থ ধরা হয়, তেমনি আল্লাহ ও তাঁর বান্দার মধ্যে মধ্যস্থ ধরা হারাম। 

যারা কাফির, মুশরিক এবং বিদআতী, তাদের ধারণা রাজা আর প্রজাদের মধ্যে যেমন আড়াল বা ব্যবধান থাকে, ঠিক তেমনি আল্লাহ ও তাঁর বান্দার মধ্যে আড়াল বা ব্যবধান আছে। যারা সাধারণ মানুষ, হিদায়াতের ব্যাপারে, রুযী-রোজগারের ব্যাপারে বা অন্যান্য • দরকারী ব্যাপারে সরাসরি আল্লাহর কাছে আবেদন জানানোর অধিকার তাদের নেই, কাজেই মাঝখানে একটা মধ্যস্থের দরকার। 

এই মধ্যস্থের মাধ্যমেই তাদেরকে প্রার্থনা জানাতে হবে। তারা আরও মনে করে, এই মাধ্যমের মারফতে আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে হিদায়াত করে থাকেন ও রুযী-রোজগারের বিতরণ করে থাকেন। 

অতএব সাধারণ লোক এই মধ্যস্থদের কাছে আকুল ফরিয়াদ জানাবে আর মধ্যস্থগণ তাদের আবেদন আল্লাহর কাছে পৌঁছে দিবে, যেমন রাজার পরিষদরা রাজার সান্নিধ্য লাভ করার দরুন তাদের কথা যেমন রাজার কাছে অধিক কার্যকরী হয়ে থাকে, ঠিক তেমনি এই পীর ফকিরের দল মধ্যস্থরূপে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করেছে বলে তাদের সুপারিশ ও আল্লাহর কাছে অত্যধিক কার্যকরী হবে, এরূপ ধারণা নিয়ে কোন ব্যক্তি কাউকে পীর, মুর্শেদ, গুরু বা পুরোহিত যে নামেই হোক না কেন, মধ্যস্থ মান্য করলে সে কাফির ও মুশরিক হয়ে যাবে। তাদের তাওবাহ্ করা ওয়াজিব। (রাসায়েলে সুগ্রা)

ইবনু তাইমিয়ার এই মন্তব্যের পর কুরআন মাজীদের একটি আয়াতের দিকে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। কুরআনের একটি আয়াতে বলা হয়েছে:

 أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ‎

‎‫وَجَاهِدُوا فِيُسَبِيْلِهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ *

 "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর আর তাঁর 'ওসীলা' অন্বেষণ কর এবং তাঁর পথে জিহাদ কর, তাহলে তোমরা পরিত্রাণ পাবে।"‬‎

এই আয়াতের মাঝে যে 'ওসীলা' শব্দ আছে, পীর সাহেবরা বলছেন, এই ওসীলার তাৎপর্য হচ্ছে মাধ্যম। তাঁরা 'ওয়ার্ তাগু ইলাইহিল ওসীলা'র অর্থ করেছেন 'আল্লাহর কাছে যাওয়ার জন্য ওসীলা বানাও'।

 পীর সাহেবরা জোর দাবী করে বলছেন, আমরা সেই ওসীলা। আমাদেরকে না ধরলে তোমাদের রক্ষা নেই। আর মুরীদরাও এই ওসীলাকে ঠেলে নিয়ে যেয়ে পীরপূজা ও কবরপূজায় রূপ দিয়ে দিয়েছে। তারা বলে-

'শায়আন লিল্লাহ চুঁ গাদায়ে মুস্তামান্দ

আলমদদ খাহাম যোখাজা নক্শ বন্দ।'

আমি নেহায়েত বাধ্য ও অভাবগ্রস্থ হয়ে নক্শ বন্দ সাহেবের কাছে আল্লাহর ওয়াস্তে কিছু চাচ্ছি।

পাঠকগণ এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্য করুন। যেখানে দাবী করা হচ্ছে ঐ সব বুজরুগ পীররা আমাদের ওসীলা। ওদের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে কিছু চাইতে হবে। আল্লাহ তা'আলাই আমাদেরকে ওদের মাধ্যমে দিবেন, কারণ আল্লাহই হচ্ছেন আসল কর্তা। কিন্তু হয়ে গেল তার উল্টা। নক্শ বন্দ সাহেবকে ওসীলা না বানিয়ে ওসীলা বানানো হল আল্লাহকে। 'শায়আন লিল্লাহ, অর্থাৎ হে বুরুগ, আল্লাহর ওয়াস্তে কিছু দিন। এ কথার দ্বারা এটাই সাব্যস্ত হচ্ছে যে, আসল দেনেওয়ালা এ পীর আর আল্লাহ হলেন ওসীলা। কি তাআজ্জুব ব্যাপার।

যাক, এখন কথা হচ্ছে, 'ওয়াবতাগু ইলাইহিল ওসীলা'র নৈকট্য লাভ করতে হলে কুরআন হাদীস মোতাবেক আল্লাহর দ্বারা আল্লাহ একথা আমাদের বলেননি যে, তোমরা পীর ধর।' ওসীলা শব্দের আসল অর্থ হচ্ছে 'নৈকট্য'। আর আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীর দ্বারাই করতে হবে। 

শাহ অলিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবী এর অর্থ করেছেন- 'আল্লাহর নৈকট্য অন্বেষণ কর। কামুস নামক বিখ্যাত অভিধান গ্রন্থে বলা হয়েছে- 'বাদশাহ বা মহান আল্লাহর নৈকট্যের নাম ওসীলা।' 

কুরআনের ভাষ্যকারগণ সমবেতভাবে ওসীলার অর্থ 'নৈকট্য' বলে উল্লেখ করেছেন। তফসীর জালালায়িনে 'ওয়াবতাগু ইলাইহিল ওসীলা'র মানে করা হয়েছে- 'ইবাদত বন্দেগীর দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ কর।' তফসীর জামেউল বয়ানে ওসীলার অর্থে বলা হয়েছে- 'ইবাদতের দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অন্বেষণ করা।' 

তফসীর খাযেনে ওসীলার তাৎপর্যে বলা হয়েছে- ইবাদত ও সৎকর্মের দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অন্বেষণ কর। তফসীর মাদারিকে 'ওসীলা' প্রসঙ্গে বলা হয়েছে- 'ওসীলা' ঐ কাজের নাম যার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। তফসীর ফতহুল বয়ানে বলা হয়েছে- 'ওসীলা' আল্লাহর নৈকট্যের নাম। 


হাফেয ইবনু কাসীর বলেছেন- 'আল্লাহর নৈকট্যের নাম যে 'ওসীলা' এ বিষয়ে কুরআনের ভাষ্যকারদের মধ্যে কোন মতভেদ নেই। তফসীর কাবীরে বলা হয়েছে- 'ওসীলা' ওরই নাম, যার সাহায্যে উদ্দেশ্য পর্যন্ত পৌঁছতে পারা যায়। এই ওসীলার উদ্দেশ্য- ঐ ওসীলা যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে কাজে লাগে। এ ওসীলা ইবাদত ও আনুগত্যের সাথে সম্পর্কিত।

মোটকথা সমস্ত অভিধান ও তফসীরের কিতাব থেকে এ কথাই জানা যাচ্ছে যে, ওসীলা ঐসব ইবাদত ও সৎকর্মের নাম, যা আল্লাহর নৈকট্য লাভে সহায়ক হয়। 

আল্লাহকে পেতে হলে ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে, সৎকর্মের মাধ্যমে, কুরআন ও হাদীসের নির্দেশের মাধ্যমেই পেতে হবে। এ নয় যে, কোন মানুষকে মাঝখানে রেখে প্রার্থনা কর, আর শেষ পর্যন্ত ঐ বুগের কাছেই চাইতে শুরু করে দাও।

"মুর্খ পীর"

যেখানে সেখানে হঠাৎ গজিয়ে উঠা কতকগুলো পীর আমরা দেখতে পাই। এরা আসলে কুরআন হাদীসের ইল্ম কিছুই জানে না। বি.এ, এম.এ, ডাক্তারী, মাষ্টারী, উকালতি, ব্যারিষ্টারী সার্টিফিকেট কারো কারো থাকতে পারে কিন্তু কুরআন হাদীসের বিদ্যায় এরা একেবারে ইয়াতিম। 

কুরআন মাজীদের যে কোন তফসীরের কিতাব অথবা বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ প্রভৃতি হাদীসের যে কোন একখানা কিতাব খুলে দিলে, এদের হিম্মত নেই যে, একটা লাইন শুদ্ধভাবে পড়ে দিতে পারে, অথচ এরাই সেজেছে মুসলিম সমাজের পথপ্রদর্শক। এরাই পীরে কামেল, হাদিয়ে জামান।

মহিমান্বিত আল-কুরআনের কোন্ আয়াত, কোন্ ঘটনাকে কেন্দ্র করে, কোন্ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, কি উদ্দেশে অবতীর্ণ হল, কুরআনের ধারক বাহক ও প্রচারক, সৃষ্টির সেরা, নবীকুল শিরোমণি, মুহাম্মাদ মোস্তফা তাঁর জীবনে যত কথা বলে গেছেন, যে সব কাজ করে গেছেন আর যে সব বিষয়ে মৌন সম্মতি দিয়ে গেছেন, সেগুলি জানবার, বুঝবার ও পড়বার সুযোগ যে হতভাগার কপালে জুটল না, সে যদি হঠাৎ চাকরী করতে করতে, ডাক্তারী বা উকালতি করতে করতে, ব্যবসা বা কৃষিকাজ করতে করতে, পীরি-মুরীদির দু'একখানা কিতাবের দু'চারটা গৎ মুখস্থ করে, লম্বা পিরাহান গায়ে দিয়ে ও লম্বা পাগড়ী মাথায় বেঁধে, হঠাৎ পীর সেজে বসে যায় আর লোকজনকে বলে যে আমার হাতে তোমরা মুরীদ হও, আমি আল্লাহ আর তোমাদের মাঝখানে মধ্যস্থ হয়ে তোমাদের সব ফরিয়াদ আল্লাহর কাছে পৌছে দিব, আর এই কথা শুনে হাজার হাজার লোক যদি সেই মূর্খের কাছে ভীড় জমায়, তাহলে সে সমাজ কোন্ স্তরে পৌছে গেছে- চিন্তা করা দরকার।

আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই সব মূর্খরা নিজেরাই নিজেদেরকে সাইনবোর্ড, পোস্টার, বিজ্ঞাপন ও খবরের কাগজের মাধ্যমে, পীরে কামেল, হাদীয়ে জামান, আওলীয়া কুল শিরোভূষণ, মুজাদ্দেদে মিল্লাত, মাহবুবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী প্রভৃতি বিশেষণে বিশেষিত করে প্রচার করতে বা কিছু দালালের দ্বারা প্রচার করাতে একটুকুও লজ্জাবোধ করে না বা দিল কাঁপে না। হায়রে স্বার্থ- তোমার মহিমা বুঝা ভার।


পীর বংশ

হিন্দু সমাজে দেখা যায় ব্রাহ্মণের পুত্র হয় ব্রাহ্মণ, পুরোহিতের পুত্র হয় পুরোহিত। ব্রাহ্মণই পৌরহিত্য করার একমাত্র অধিকারী। কেননা হিন্দু ধর্মমতে ব্রাহ্মণ ব্রহ্মার মুখ হতে উৎপন্ন হয়েছে। সেজন্য ব্রাহ্মণকে বলা হয় বর্ণ শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ মারা গেলে তার ছেলে হয় পুরোহিত। 

ছেলে মারা গেলে তার ছেলে, ছেলের ছেলে তস্য ছেলে- এভাবে বংশানুক্রমে এ পৌরহিত্য চলতেই থাকে। পাণ্ডিত্য থাক আর না থাক, কিছু যায় আসে না। কারণ পৌরহিত্য করাটা হচ্ছে ব্রাহ্মণদের বংশগত ব্যাপার।

বলাবাহুল্য, হিন্দু সমাজের মত আমাদের সমাজেও এক শ্রেণীর বংশ গজিয়ে উঠেছে আর সেটা হচ্ছে এই পীর বংশ। পীর বংশের সবাই পীর, পীর বাবা, পীর মা, পীর দাদা, পীর দাদী, পীর নানা, পীর নানী, পীর খালা, পীর খালু, পীর ভাই, পীর বোন ইত্যাদি সবাই পীর। পীরে পীরে সব একাকার। 

পীর সাহেব ইন্তিকাল করলেন, ব্যাস্ তাঁর ছেলে হয়ে গেলেন গদ্দীনশীন পীর। ছেলে ইন্তিকাল করলে তাঁর ছেলে, ছেলের ছেলে তস্য ছেলে- এভাবে ব্রাহ্মণদের মত বংশানুক্রমে পীরগিরি চলতেই থাকে। পীর সাহেবের একাধিক ছেলে থাকলে করে নেন সব এলাকা ভাগ। 

অনেক সময় এলাকা ভাগ নিয়ে গদ্দীনশীনদের মধ্যে লাঠালাঠি, ফাটাফাটি, এমনকি কোর্টকাছারী পর্যন্ত ছুটাছুটি করতেও দেখা যায়। ঠিক এ যেন ফারায়েজ সূত্রে পৈত্রিক সম্পত্তির ভাগ বাঁটোয়ারা, ঠিক এ যেন বাপের জমিদারী নিয়ে কাড়াকাড়ি। 

পীর সাহেবের ছেলে না থাকলে ভাই, ভাতিজা, জামাই বা নাতি-পুতা যেই থাক, সেই সেজে বসে গদ্দীনশীন। কারণ এহেন লাভজনক জমিদারীটা বংশের বাইরে যেন চলে না যায়। বিদ্যা না থাক, ইল্ম-কালাম না থাক, কি তাতে আসে যায়। পীরের গন্ধতো আছে। পীরের 'নুৎফায়' পয়দা তো বটে।

বাংলাদেশি যুবক ও এক রোহিঙ্গা তরুনীকে নিয়ে লেখা "আমিরুল মোমেনিন মানিক" দারুন এক উপন্যাস লিখেছে পড়ে দেখুন ভালো লাগবেই। ৪ টি ছোট ছোট পর্বে সমাপ্ত হয়েছে।

▶️ রোহিঙ্গা তরুনী পর্ব-১

▶️ রোহিঙ্গা তরুনী পর্ব-২

▶️ রোহিঙ্গা তরুনী পর্ব-৩

▶️ রোহিঙ্গা তরুনী পর্ব-৪

🌹 ধন্যবাদ 🌹






বিনা পুঁজির ব্যবসা

পাঠক হয়তো ভাবছেন, মানুষ পীরগিরি করার জন্য এত লালায়িত কেন? মানুষ পীর বলে দাবী করে, বিভিন্ন বিশেষণে নিজেকে বিশেষিত করে, পোষ্টারে, বিজ্ঞাপনে, খবরের কাগজে ও মাইকিং করে নিজকে এত প্রচারণা করে বেড়ায় কেন? কেউ কাছে যেয়ে একটু বসে মুরীদ না হয়ে যদি চলে আসে, তাহলে পীরের মনটা খারাপ হয় কেন? কুরআন হাদীস না পড়েই মানুষ পীর সেজে লোকের দ্বারে দ্বারে ভক্ত বানাবার জন্য ঘুরে বেড়ায় কেন? অধিকতর যোগ্য লোক থাকা সত্ত্বে পীরের অযোগ্য বা মূর্খ বেটা, ভাই ভাতিজা বা জামাই পীর হয় কেন? কেন পীরগিরিটাকে বংশের বাইরে যেতে দেয়া হয় না। 

এই পীরগিরিতে আছে কি? পাঠক একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন, এখানে বিরাট এক স্বার্থের খেলা চলছে। সত্যি কথা বলতে কি- পীরগিরির মত লাভজনক ব্যবসা আর কিছুই নেই। আর এতে পুঁজি লাগে না, বিনা পুঁজির ব্যবসা। আপনার ইনকামে আপনার সংসার চলে না, বেড়ার ঘর আপনার পাকা হয় না। 

চিন্তার কোন কারণ নেই। লম্বা পিরাহান গায়ে দিয়ে, মাথায় একটা পাগড়ি বেঁধে, যিক্রে বক্সে যান আর ওখানে খানকা শরীফ চিশতিয়া, খানকা শরীফ কাদেরিয়া, খানকা শরীফ জালালিয়া, খানকা শরীফ আহমাদিয়া প্রভৃতি নামের যে কোন একটা নাম চয়েস করে সাইনবোর্ড লিখে ঝুলিয়ে দিন। আর নিজেকে কোন এক পীরের খলিফা
বলে দাবী করুন।

 দেখবেন লোক জুটবে, টাকাও যথেষ্ট পাবেন। বেড়ার ঘর আপনার পাকা হয়ে যাবে। তারপর মাঝে মধ্যে ইসালে সওয়াব কিংবা উরুশ শরীফের মেলা বসাবেন, তখন দেখবেন কোথায় লাগে জমিদারী। হাজার বিশেক লোক যদি জুটাতে পারেন আর কি চাই। খালি হাতে কেউ আসবে না। গড়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে দশটা করে টাকা পেলেও লাখ দুয়েক টাকা হয়ে যাবে। 

আর যাদের বিশ পঞ্চাশ লাখ ভক্ত আছে তাদের কথা তো চিন্তাই করা যায় না। তারপর ভক্তরা শুধু যে টাকাই আনবে তাই নয়। কেউ আনবে তেল, কেউ আনবে ঘি, কেউ আনবে চাল, কেউ আনবে ডাল, কেউ আনবে আলু, কেউ আনবে
লাউ-কুমড়া, কেউ আনবে খাসি, কেউ আনবে মোরগ, কেউ আনবে হরিণ, কেউ আনবে গরু। অবশ্য সব উরুসের মেলায় গরু নিয়ে যেতে দেয়া হয় না। 

কারণ, যে সব পীর ধর্মনিরপেক্ষ পীর বা যেসব খানকায় হিন্দু, মুসলমান, মেথর, মাড়োয়াড়ী সবাই তীর্থ করতে যায়, সেখানে গোমাংস কেন যাবে। গরুর গোশত ধর্মনিরপেক্ষ খাদ্য নয়, ওটা হচ্ছে মুসলমানদের প্রিয় খাদ্য- সাম্প্রদায়িক খানা। যাক ভক্তরা যা নিয়ে আসবে, তাই তারা খেয়ে শেষ করতে পারবে না, মোটা অংকের কিছু বেঁচে যাবে।

 তাহলে বুঝুন, পীরগিরি ব্যবসাটা কতবড় লাভজনক ব্যবসা। এ ব্যবসার নেশা যাকে পেয়ে বসেছে- সেকি সহজে তা ছাড়তে চায়, তাছাড়া কেউ রাজনীতি করেন, ইলেক্শনে নেমেছেন, ভোট চাই হোমরা চোমরা একটা কিছু হতেই হবে। দেখলেন ওমুক পীরের ভক্ত এখানে অনেক। লাখখানেক টাকা নিয়ে যেয়ে পীর সাহেবের হাতে দিয়ে বললেন হুজুর, জারা মেহেরবানী কিজিয়েগা। 

হুজুর ভক্তদেরকে বলবেন, তোমরা ভোটটা ইনাকেই দিও, কারণ ইনি আমার খাস ভক্ত। এভাবে কতদিক থেকে কতভাবে যে টাকার আমদানী হয় তা কল্পনাই করা যায় না। আমি এমন এক এলাকার খবর রাখি, যেখানে বর্তমানে কোন পীর নেই। পীর সাহেব কিছুদিন আগে ইন্তিকাল করায় আসন একেবারে খালি। 

ব্যাস্ আর যায় কোথায়, দু'তিনজন বুজরুগ ব্যক্তি পীর হওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। একজন প্রত্যেক জামাআতে ঘুরে ঘুরে বলে বেড়াচ্ছেন, আমি বুজরুগ ব্যক্তি, আমিই পীর হওয়ার একমাত্র উপযুক্ত, অতএব তোমরা আমার কাছেই মুরীদ হও। আর একজন যেয়ে বলেছেন, শুনলাম নাকি ওমুক তোমাদের কাছে পীর হওয়ার জন্য এসেছিল। 

খবরদার হুশিয়ার! আমি ওমুকের বেটা ওমুক, ওর থেকে পীর হওয়ার যোগ্যতা আমার মাঝেই বেশী, অতএব আমার কাছেই তোমরা মুরীদ হও। একদিন ঐ এলাকার এক শিক্ষিত যুবক বলল, আচ্ছা বলুন তো বুজরুগ্রা এমন করে বেড়াচ্ছেন কেন? আমি বললাম, উনাদের কি অন্য কোন এলাকায় মুরীদ আছে? বলল, কিছু কিছু আছে। 

আমি বললাম বুঝতে পারছনা, শুনো তোমাদের এলাকা হল ধানের এলাকা, প্রচুর ধান হয়। আলু পেঁয়াজও মন্দ হয় না। এখন কোনমতে শতখানেক গ্রাম যদি একজন বুরুগ হাতে রাখতে পারেন, তো আর যায় কোথা; প্রত্যেক গ্রাম থেকে কমপক্ষে গড়পরতা মণ দশেক করে ধান যদি আদায় করতে পারেন তো একহাজার মণ ধান পাওয়া যাবে। 

পাঁচ মণ করে আলু পেয়াজ আদায় করতে পারলে, পাঁচশ' মণ আলু পেয়াজ হবে। তারপর যাকাত, ওশর, ফিতরা ও কুরবানীর চামড়ার অর্ধেক বা সিকি তো আছেই, তাহলে দু'চার শ' বিঘা জমির চেয়ে এই পীরগিরিতেই বেশী ফায়দা। আর এ দুনিয়াটা হল বড় বিচিত্র, আর এখানকার মানুষগুলোও বড় বিচিত্র। 

কাজেই এ দুনিয়ার একদল সুযোগ সন্ধানী এ সুযোগটা ছাড়বে কেন? ভক্তদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের আরও ফন্দী আছে। যেমন পীর সাহেব একটা মাদ্রাসা ঘর তৈরী করলেন। ভক্তদের মধ্য হতে দু'একজন উসতাযী রাখলেন। দু'চারটা তালবিলিমকে জা'গীর করে দিলেন। 

এবার হাজার হাজার ভক্তদের মাঝে যেয়ে বলতে লাগলেন- বাবারা! এবার ওরশ, যাকাত, ফিতরা কুরবানী সবই আমাকে দাও। বাগান দাও, সম্পত্তি দাও। কারণ, আমি বিরা এক কাজে হাত দিয়েছি। এদেশের কোন ছেলেকে দিল্লী, লাক্ষ্ণৌ, সাহারনপুর আর মিসর যেতে দিব না। ওখানকার পড়া আমার এখানেই হবে। বিরাট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছি, তোমরা কেবল টাকা দাও- টাকা দাও।

ভক্তরা দিতে লাগল টাকা, দিতে লাগল জমি, দিতে লাগল আরো অনেক কিছু। মাদ্রাসার নামে পাওয়া গেল জমি, পাওয়া গেল বাগান, পাওয়া গেল পুকুর, পাওয়া গেল প্রচুর অর্থ কিন্তু মাদ্রাসার উন্নতি আর হল না। বিরাট পরিকল্পনা পীর সাহেবের কলবের মধ্যেই থেকে গেল। এখন কৈফিয়ৎ তলব করবে কে? পীর সাহেবই তো সব। 

তিনিই প্রতিষ্ঠাতা, তিনিই পরিচালক, তিনিই সেক্রেটারী, তিনিই ক্যাশিয়ার- তিনিই সব। তাঁর কাজে ভুল ধরতে গেলে চরম বেআদবী হবে। শিষ্য থেকেই সে খারিজ হয়ে যাবে। কিয়ামতের মাঠে সে পীর সাহেবের শাফাআতই পাবে না। অতএব, যা করেন বাবা পীর কেবলা। 

পীর সাহেবের ইন্তিকালের পর দেখা গেল, তাঁর ছেলেরা পীরত্ব ঠিকই বজায় রেখেছেন, মাদ্রাসার নামে টাকাও আদায় করছেন; মাদ্রাসাটি কাজীর গরু কিতাবের মত ঠিকই বহাল রেখেছেন, আর মাদ্রাসার যাবতীয় সম্পত্তি ভাগ বাটোয়ারা করে নিজেদের নামে রেকর্ড করে নিয়ে সুখে স্বাচ্ছন্দে ভোগ দখল করছেন।

মোটকথা পীর বংশটা বংশানুক্রমে বিনা পরিশ্রমে আরামসে যাতে দিন গুজরান করতে পারে, পীরগিরিটা হচ্ছে তারই একটা শ্রেষ্ঠ অবলম্বন। তবে সুখের বিষয় এই, বর্তমানে অধিকাংশ লোক পীরগিরির এসব ছলচাতুরী ধরে ফেলেছেন।




Post a Comment

0 Comments

শিয়া সুন্নিদের হাদিস কতগুলো

কিয়ামুল লাইল কি তারাবীর নামাজ?
Chat with us on WhatsApp